৬ । মনস্তত্ত

Standard

রাহাত বহু কষ্টে নিজেকে ধরে রেখেছে । কিন্তু মনে হচ্ছে আর বেশিক্ষণ পারবে না । মেয়েদের সাথে অশ্লীল ব্যাবহার তার মোটেই পছন্দ নয় । 

 পাশে দাঁড়ানো লোকটার মুখে একটা ঘুষি বসিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তার বহুক্ষণ ধরেই হচ্ছে ।

 

 বাসে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত । ঢাকায় সিটিং সার্ভিস কয়টা আর কাজে সিটিং ? দিনের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলোয় – যখন চেকার বাসে উঠে – তখনই এরা ভদ্র হয়ে যায় । বাকি সময়গুলো হেল্পারদের ধান্ধাই থাকে ড্রাইভারের কোল পর্যন্ত একটা মানুষ তোলার ।

 

 ভাগ্যকে মেনে নিয়ে রাহাতও দাঁড়িয়ে ছিল ।

 এক তরুণীকে রাহাতের মতই বাধ্য হয়ে দাঁড়াতেই হয়েছে । রাহাত সীট পেলে নিশ্চয় ছেড়ে দিত । পাশের লোকটা ভীড়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছে করেই মেয়েটার কোমড়ে হাত দিচ্ছে । যদিও মুখে ফুটিয়ে রেখেছে রাজ্যের সারল্য । আর ওদিকে লজ্জায়-অপমানে মেয়েটা লাল হয়ে আছে ।

 

 হঠাৎ বাসের রড বাম হাতে ধরে ব্যালেন্স ঠিক করে ডান হাতে সপাটে ঘুষি চালায় ও অভদ্রটার মুখ বরাবর । মটমট করে একটা শব্দের সাথে মুখ থেকে রক্তের সাথে বেড়িয়ে আসে দুটো দাঁত । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা ।

‘ঘরে তোর মা-বোন ছিল না কখনও ?’ দাঁতে দাঁত পিষে বলে রাহাত । ‘মেয়েদের সম্মান করতে শেখ, ****[লেখার অযোগ্য ] ।’

বাসজুড়ে হট্টগোল পড়ে যায় । অন্যান্য যাত্রীরা উঠে সরিয়ে দেয় রাহাতকে । হেল্পার এগিয়ে আসে ।

‘তুমি হালার পো কোন এলাকার মাস্তান?’ রাহাতের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে । ‘নিরীহ একটা মানুষের মুখে এভাবে মারো?’

তাকে সায় দিয়ে ঘিরে ধরে আরও কয়েকজন ।

*

মাঝপথে থেমে যায় বাসটা । ছুঁড়ে ফেলা হয় রাহাতকে ।

 রাস্তা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় রাহাত । নাক থেকে গড়িয়ে আসা দু’ ফোঁটা রক্তের ফোঁটা হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুছে ফেলে ।

 নিস্ফল আক্রোশে লাথি দেয় রাস্তায় ।

 

 স্রেফ একটা মেয়েকে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল । অথচ কেউ সেটাকে পাত্তাই দিল না । তার কথা কেউ শোনার প্রয়োজনও মনে করল না ! কোট-টাই পড়া অমানুষটাকেই সবার ভদ্রলোক বলে মনে হল ?

আর মেয়েটা পুরো সময় ফুঁপিয়ে কাঁদছিল । ওই শালী কিছু বলতেই পারত ! ‘যার জন্য করলাম চুরি – ’ বিড়বিড় করে রাহাত ।

 

 ঘাড় মটকে চায়ের দোকানে আসে ও ।

‘মামা, পানি দেন একগ্লাস ।’

পানি রুমালে ঢেলে নাক থেকে রক্ত মোছে রাহাত । এই সময়ই প্রথম শোনে ও সুরেলা কন্ঠটা ।

‘আপনার কি বেশি লেগেছে ?’

ঘুরে দাঁড়িয়ে ও দেখতে পায় সেই তরুণীকে । ওএ বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলার সময়ই নিশ্চয় নেমে এসেছে ! মেজাজ টং হয়ে যায় রাহাতের । ‘বাস ভর্তি মানুষ যখন আমাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছুঁড়ে ফেলছিল তখন একটা শব্দও মুখ থেকে বের হয়নি আর এখন এসেছ পিরীতির আলাপ করতে !!’ মনে মনেই খেদ ঝাড়ে ও ।

‘না ।’ মুখে কিছু বলা লাগে তাই বলে ও ।

‘আমি খুবই দুঃখিত ।’ আবার ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা । ভাল ছিচকাঁদুনের পাল্লায় পড়া গেছে – ভাবে রাহাত ।

‘আপনার দুঃখ নিয়ে আপনার পথে চলে গেলেই আমি খুশি হতাম ।’ বেশ জোরেই বলে রাহাত, ‘প্লিজ!’

 

চায়ের দোকানদার আর কাস্টোমাররা ওর দিকে তাকিয়ে আছে ।

 ভাল তো !

রাস্তায় তরুণ-তরুণীকে দেখলেই বিশেষ লুক দেওয়া হয় এই দেশে । আর এ তো নাক থেকে রক্তের ফোঁটা মুছতে থাকা তরুণের হুংকার । তাকাবে – সন্দেহ কি তায় !

গ্লাসটা দোকানে ফেরত দিয়ে সামনে হাঁটা দেয় রাহাত । ভয়ে ভয়ে গ্লাস ফেরত নেয় দোকানীও ।

 মেয়েটার দিকে একবারও ফিরে না তাকিয়ে রিকশা নেয় ও ।

 বাসায় যাওয়ার পথে একদফা নাটক হয়ে গেছে । আরেকবার বাসে উঠে ঝামেলায় যেতে চাইল না ও ।

*

কলিংবেলের শব্দ শুনেও পাত্তা দেয় না রাহাত । এই রাতের বেলা কারও আসার কথা না ।

 আর কেউ আসলেও সে এমন লাটসাহেব হয়ে যায়নি যে কলিং বেলের শব্দ শুনেই ছুটতে হবে ।

 এমনিতেই বাসায় কেউ নেই ।

 বাবা-মা আর ছোটভাইকে কয়েক মাস থেকে করা প্ল্যান অনুযায়ী গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ও । রাহাতেরও যাওয়ার কথা ছিল – হরতালে পিছিয়ে যাওয়া সেমিস্টার ফাইনালের জন্য আটকে গেল ।

 

 আধঘন্টা পর আবারও কলিং বেল ।

 এবার একটানা চারবার ।

 বাবার পিস্তলটা হাতে নিয়ে সেফটী ক্যাচ অফ করে রাহাত । সাবধানের মার নেই । রাতের বেলা ইদানিং হামেশা ডাকাতি হচ্ছে ।

 

 দরজা খুলে হাল্কা ফাঁক করে রাহাত ।

 বিকালের সেই সমস্ত গন্ডগোলের হোতা মেয়েটা দাঁড়িয়ে ।

‘আমার বাসা খুঁজে পেলে কি করে?’ কোমড়ের পিছে পিস্তলটা লুকোয় রাহাত । বেশ রুক্ষস্বরেই প্রশ্নটা করে ।

‘আপনাকে ফলো করেছিলাম । আই অ্যাম সরি । আজ আপনার সাথে যা হল সেজন্য সত্যিই খুব খারাপ লাগছে আমার । তাও আবার আমার জন্য ।’ চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খুবই ভয়ে আছে মেয়েটা, ‘আপনি ক্ষমা না করলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না ।’

 ‘আদর্শবতী !’ – রাগে দাঁত কিড়মিড় করে রাহাত । মুখে যদিও বলে ভিন্ন কথা –

‘আমি কিছু মনে করিনি । ওদের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক ছিল । তোমার ব্যাপারটা আমি বুঝি । পাবলিকলি কিছু বলতে পার নি । এটা নিয়ে প্লিজ আর চিন্তা করবে না । উই আর ইভেন ।’

 ‘আসি তাহলে ?’

 ‘জ্বী – আসতে পারেন ।’ ‘তুমি’ থেকে আবার ‘আপনি’তে ডাইভার্ট হয়ে গেল রাহাত । একে খ্যাদানোটা প্রথম কথা ।

‘ওহ – বাই দ্য ওয়ে, আমি তন্বী ।’

 ‘আমি রাহাত ।’ ভদ্রতা করেও ভেতরে ডাকে না রাহাত ওকে । কাজ পড়ে আছে ।

‘আসি রাহাত ভাই । আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব আমি ।’

দরজা লাগায় রাহাত ।

*

গত কয়েকদিন ধরে সাইকোলজির ওপর একটা নতুন থিওরি নিয়ে গবেষণা করছে রাহাত । যদিও ও কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র – সাইকোলজি বিষয়টা ওর প্যাশন ।

 তন্বীকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানানোটা হয়ত ভদ্রতার দাবী রাখে – কিন্তু সারাদিনের অভিজ্ঞতা এবং নতুন গবেষণার ব্যাপারটা মিলিয়ে এতদিকে খেয়াল ছিল না ওর ।

 আবার দ্রুত ফিরে আসে রাহাত ওর রুমে ।

 

 যেখানে শেষ করেছিল চিন্তা সেখানে নিজেকে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করে ও ।

 একবার মনোযোগ নিয়ে এসে ভেঙ্গে গেলে আবার ফিরিয়ে আনাটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ।

 বেশ কয়েক মিনিট পর নিজের চিন্তায় ঢুকে পড়তেই খুট করে একটা শব্দ হয় ঘরের দরজার কাছে ।

 সেদিকে তাকিয়েই চমকে যায় রাহাত ।

 

 তন্বী এলোমেলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে ।

 ও কোনদিক দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল ?

‘তুমি এখানে কি করছ ?’ কঠোর কন্ঠে বলতে গিয়েও থেমে যায় রাহাত ।

 শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাপড় ছেঁড়া মেয়েটার ।

 হাতে একটা কিচেন নাইফ ।

 

 মুখ দিয়ে একটা জান্তব শব্দ করে রাহাতের ওপর ছুরি বাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটা ।

 বিদ্যুতবেগে গড়িয়ে সরে যায় রাহাত । বিছানায় গেঁথে যায় ছুরির ফলা ।

 টান দিয়ে বের করে আবার রাহাতের দিকে এগিয়ে আসে তন্বী ।

 

 লাথি দিয়ে চেয়ারটা ওর দিকে পাঠিয়ে দেয় রাহাত ।

 অপার্থিব একটা লাফ দিয়ে ওর সামনে চলে আসে তন্বী । কোন বাধা না পেয়ে খাটের সাথে ধাক্কা খায় চেয়ারটা ।

 এই প্রথমবারের মত আতংক অনুভব করে রাহাত ।

 মেয়েটা কি মানুষ ? একটা আহত মেয়ে কিভাবে এক লাফে চারফুট ওপরে ওঠে ?

 

জীবনবাজি রেখে ছুটে ঘর থেকে বের হয় ও ।

 পেছনে জান্তব শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসে তন্বী ।

 ডাইনিং টেবিল থেকে একটা গ্লাস ছুঁড়ে মারে রাহাত ওর দিকে ।

 স্রেফ বাতাসে ভেসে এড়িয়ে যায় মেয়েটা । বিকট শব্দে গ্লাসটা ভাঙ্গে দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে ।

 

 আর একমুহূর্ত নষ্ট না করে ছুট লাগায় রাহাত ।

 বাবা-মার ঘরে এসে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকায় । ওখানেই রেখছিল তো ?

হ্যাঁ । ভদ্র ভঙ্গীতে শুয়ে থাকা পিস্তলটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাহাত ।

 হাতে ঠান্ডা – মসৃণ বাটটার ছোঁইয়া পেতেই পেছনে দড়াম করে পুরোপুরি খুলে যায় দরজা ।

 মেয়েটার চেহারার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে , মুখ বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ছে ।

 পরের সেকেন্ডেই উদভ্রান্তের মত রাহাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তন্বী।

 পাগলের মত গুলি চালায় রাহাত ।

 

 তিনটি গুলি বেরিয়ে যাওয়ার পর লক্ষ্য করে সবগুলো মিস করেছে তাড়াহুড়োয় ।

 ছুরি ধরা হাত মাথার ওপর তোলে মেয়েটা মরণ আঘাত হানতে ।

 পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে দুইবার গুলি করে রাহাত ।

 ছিটকে পেছনের দিকে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যায় মেয়েটা । এবং পড়েই থাকে ।

 রক্তের ক্ষীণ একটা স্রোত বয়ে যায় রুমের মেঝেতে – তরলের নিম্নগামীতার সূত্র মেনে নিয়ে ।

*

রাত ১২টা ।

 রাহাতদের রোডেই খালি একটা প্লট ।

 বেলচা দিয়ে যতদূর সম্ভব নিঃশব্দে কবর খোঁড়ে রাহাত ।

 আলতো করে শুইয়ে দেয় মেয়েটাকে ।

 

 খুনটা করে ফেলার পরই তীব্র আতংক গ্রাস করে ওকে ।

 যদিও স্রেফ আত্মরক্ষার খাতিরেই কাজটা করতে হয়েছে ওকে – কিন্তু মানুষ খুন যে কাওকে স্বাভাবিক বুদ্ধি থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে ।

 নির্জন ছিল জায়গাটা । ও ছাড়া কোন সাক্ষী নেই, কেন ‘জলবৎ তরলং’ একটা ব্যাপারকে থানা-পুলিশের পর্যায়ে নিয়ে যাবে ও ?

 

লাশটাকে মাটিচাপা দিয়ে নিশ্চিন্ত হয় রাহাত । এই প্লটে আগামী বছরের আগে কাজ শুরু হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই – জানে রাহাত । তারপর কংকাল উদ্ধার করে ছাই করে ফেলবে পুলিশ ।

 বাসার দিকে ক্লান্ত পায়ে ফিরে চলে ও । রক্তের দাগ পরিষ্কার করতে হবে ।

*

এখানেই পুরো ঝামেলা শেষ হতে পারত – কিন্তু শেষ হওয়ার পরিবর্তে বেড়েই চলল তা ।

 পরদিন সকালে নাস্তা করতে বের হয় রাহাত ।

 বাবা-মা না থাকলে নাস্তাটা বাইরেই সারে ও ।

 রাস্তায় পা রাখতেই ওপাশ থেকে হেঁটে আসে তন্বী ।

 

 তীব্র আতংকে জায়গাতে জমে যায় রাহাত ।

 হাসিমুখে ওকে পাশ কাটিয়ে রাস্তা দিয়ে মেয়েটা হেঁটে যায় উল্টোদিকে ।

 মাথা দুই হাতে ঢেকে বসে পড়ে রাহাত ।

 

 চারদিকে ঝলমলে দিনের আলো । এর মাঝে এসব ব্যাখ্যাহীন কিছু দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না ও মোটেও ।

 আধঘন্টা পর নিজেকে বোঝায় ও – তন্বীর মত দেখতে কেউ ছিল ওটা । মনের জোর একত্র করে নাস্তা সেরে আসে ।

 রোডের শেষ মাথায় স্পষ্টই তন্বীকে দেখে রাহাত । ছুটে যায় এবার ও বেপরোয়া হয়ে ।

 কিন্তু আগেই সরে যায় তন্বী । রোডের শেষ মাথায় পৌঁছে দুইপাশে কাওকে দেখে না ও ।

*

এক মাস পেরিয়ে গেছে ।

 প্রথমদিকে দূরে দূরে দেখত ও মেয়েটাকে । কিন্তু যত দিন যাচ্ছে কাছে আসছে ওটা ।

 রাতে কিংবা দিনে এখন বাড়ির ভেতর দেখতে পায় রাহাত মেয়েটাকে ।

 

 সেদিন স্বপ্নে দেখে ওর সাথে তন্বীর বিয়ে হয়ে গেছে ।

 থাইল্যান্ডে ঘুরতে এসে নৌকা ভ্রমণে বেড়িয়েছে ওরা । হাসিতে মুখর নবদম্পতির প্রমোদতরী ।

 পাশ দিয়ে আরেকটা নৌকা চলে যায় – তাতে এক মা দাঁড়িয়ে আছে তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে । স্বামীপ্রবর কিন্তু ঠিকই হাত নাড়ে । রাহাতও হাত নেড়ে সায় দেয় ।

 হিস হিস শব্দে ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হয় রাহাত, ‘আমার ওরকম একটা বাচ্চা থাকতে পারত । তোর জন্য শুধু …’ জান্তব শব্দ করে এরপর মেয়েটা । নৌকার একাংশ ভেঙ্গে তার সাথেই পানিতে তলিয়ে যায় ও ।

 নৌকার বাকি অংশও ডুবে গেলে পানিতে পড়ে বৃথায় হাত-পা ছুঁড়ে রাহাত । সাঁতার পারে না ও ।

 দম আটকে আসায় হাত পা ছোঁড়ে – আর ঘুমটা তখনই ভেঙ্গে যায় ওর ।

 

 চোখ খুলতেই দেখতে পায় তন্বীকে । ওর গলা দুই হাতে টিপে ধরেছে ।

 জিহবা কিছুটা বের হয়ে আছে ওর । দুই চোখে জীঘাংসা ।

 হঠাৎ মা লাইট জ্বালান ।

‘কি হয়েছে বাবা তোর ? চিৎকার করছিস কেন?’ লাফ দিয়ে বসে রাহাত ।

 তন্বী নেই কোথাও ।

*

তন্বীর সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা থেকে সব কিছুই খুলে বলে রাহাত এক নাগাড়ে ।

 ড. সাদেক মন দিয়ে শোনেন ।

 ড. সাদেক সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টাল হেড । বাংলাদেশের সেরা সাইক্রিয়াস্টিকদের মধ্যে অন্যতম ।

 

 রাহাতের এখন ফাঁসীর দড়ি গলায় নিতেও আপত্তি নেই – ও শুধু মুক্তি চায় এই বিভীষিকার হাত থেকে ।

 সব শুনে রাহাতের চোখের দিকে তাকান ড. সাদেক ।

‘রাহাত – তোমার ব্যাচমেট মিথিলার সাথে তোমার ঠিক কি ধরণের সম্পর্ক ছিল?’

 ‘স্যার?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে রাহাত ।

‘আমার কাছে লুকালে তোমাকে আমি কিভাবে সাহায্য করব বল ?’

কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে রাহাত । তারপর মুখ খোলে, ‘আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম ।’

 ‘মিথিলার সুইসাইডের কারণ তুমি জানতে রাহাত?’ তীরের মত পরের প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন ড. সাদেক ।

 চুপ করে থাকে রাহাত ।

 

 বাধ্য হয়ে আবারও মুখ খোলেন ড. সাদেক –

 ‘দেখ, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সাইক্রিয়াস্টিক বলা হয় আমাকে । কেন, জানো ? আমি প্রতিমুহূর্তে দেখা মানুষের মনের অবস্থা নিয়ে ভেবে যাই । এখন অনেক কিছুই বুঝে ফেলাটা আমার মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে । তুমি বা মিথিলা কাওকে কিছু না বললেও অনেক কিছুই আমি জানি – যেটা আর কারও জানার কথা না । কিন্তু বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হলে আমার তোমার সাহায্য দরকার । এবং কেবল এভাবেই তোমাকে সাহায্য করা সম্ভব আমার পক্ষে ।’

মিনিট দুয়েক চুপ থেকে তাকায় রাহাত, ‘মিথিলা অন্ত্বঃসত্তা ছিল । আমার সন্তান নিয়ে । ওটা ছিল একটা অ্যাকসিডেন্ট । কিন্তু তখন আমরা কেবল সেকেন্ড ইয়ারে । বিয়ের ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য বলে মিথিলা আমাকে । আমি …’ চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি মোছে রাহাত ।

‘আমি ফিরিয়ে দেই ওকে সেদিন । পরদিন শুনি আত্মহত্যা করেছে মিথিলা ।’

 

 ‘তোমার বাসায় যাওয়া যাবে এখন, রাহাত ?’ প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে ফেলেন ড. সাদেক ।

*

বাবা-মা দুইজনই অফিসে । ছোট ভাইটা স্কুলে ।

 বাসা খালি দেখে স্বস্তি পায় রাহাত ।

‘তোমার বাবা-মার ঘরে নিয়ে চল আমাকে ।’ ভেতরে ঢুকেই বলেন ড. সাদেক ।

 ঘরটায় ঢুকে চারপাশে তাকান তিনি । বুকশেলফটা দেখেন । দেওয়ালগুলো খেয়াল করেন কাছ থেকে । তারপর ফিরে আসেন ড্রইং রুমে ।

 

‘রাহাত – তোমার সিজোফ্রেনিয়া আছে । এটা অডিটরি এবং ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশনের সমন্বয় । যা আসলে ঘটছে না – এমন কিছু দেখতে পাও তুমি – শুনতে পাও । তোমার মস্তিষ্কের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এটা । ’

 ‘স্যার আমি জানি সিজোফ্রেনিয়া কি। কিন্তু আপনি কিভাবে -’

 ‘মিথিলার ঘটনায় তুমি ভয়ানক আপসেট ছিলে । নিজেকে শাস্তির যোগ্য মনে করেছিলে । মিথিলা কোন নোট রেখে যায় নি । পোস্ট মর্টেমে তার পরিবার রাজি হয় নি । তুমিও মুখ খোল নি । কেউ জানে না আসলে মিথিলার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী । এজন্যই তন্বী নামের কাল্পনিক মেয়েটা তোমাকে স্বপ্নে সন্তানের কথা বলে অভিযোগ করে । এবং এখন পর্যন্ত তোমাকে বিরক্ত করে আসছে । এটা তোমার নিজেকে দেওয়া নিজের পক্ষ থেকে শাস্তি ।’

 

 ‘আমি নিজের হাতে গুলি করি তন্বীকে । ওকে একটা পশুর মত পুঁতে রাখি খালি প্লটে । ওর মৃত্যুর পর আমি যা দেখি তা সিজোফ্রেনিয়া হতেই পারে । কিন্তু স্যার আমি তন্বীর মৃত্যুর জন্য দায়ী । ’

 ‘না, রাহাত । তন্বী বলে কোন মেয়ের সাথে তোমার পরিচয় হয়নি । বাসের কেউ তোমার কথায় কান দেয় নি । চায়ের দোকানদার তোমার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল । কারণ – তুমি বাতাসের সাথে কথা বলছিলে তখন ।’

 ‘অসম্ভব – আমি ওকে গুলি করি …’

 ‘তুমি বলেছ – তুমি গুলি করেছিলে পাঁচবার । শেষ দুইবার লাগাতে পেরেছ । ’

 ‘এক্স্যাক্টলি, স্যার !’

 ‘অথচ বুকসেলফে পাঁচটা বুলেটই গেঁথে থাকতে দেখলাম আমি । বলতে চাও দুইটা গো-থ্রু উয়ন্ড একটা মেয়েকে ইন্সট্যান্টলি মেরে ফেলতে পারে ? বুলেটে কথা বাদ দাও – তোমার ছোঁড়া গ্লাস অথবা চেয়ার কোনটাই নাগাল পায়নি মেয়েটার ।’

 ‘তাহলে স্যার – আমি তন্বী – মানে খুনটা করিনি ?’ বিশাল বোঝা নেমে যায় রাহাতের বুক থেকে।

‘না ।’ মুচকি হাসেন ড. সাদেক, ‘আর মিথিলার ব্যাপারে তুমি যথেষ্ট অনুতপ্ত । আমি মনে করি সত্যটা আমাদের দুইজনের মধ্যেই চাপা থাকতে পারে ।’

*

রাত ১২টা ।

 রাহাতের বর্ণনা অনুযায়ী খালি প্লটটায় চলে আসেন ড. সাদেক ।

 কৌতুহলই তাকে টেনে আনে । সকালে রাহাতকে দেওয়া ব্যাখ্যাটার সত্যতা জানার একটাই উপায় ।

 

 বেলচা চালিয়ে নিঃশব্দে খুঁড়ে যান ড. সাদেক ।

 নরম কিছুতে বেলচা পড়তেই থমকে যান ডক্টর ।

 

 আধপচা মেয়েলি একটা হাতের দিকে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ড. সাদেক ।

 

Image

Advertisements