৬ । মনস্তত্ত

Standard

রাহাত বহু কষ্টে নিজেকে ধরে রেখেছে । কিন্তু মনে হচ্ছে আর বেশিক্ষণ পারবে না । মেয়েদের সাথে অশ্লীল ব্যাবহার তার মোটেই পছন্দ নয় । 

 পাশে দাঁড়ানো লোকটার মুখে একটা ঘুষি বসিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে তার বহুক্ষণ ধরেই হচ্ছে ।

 

 বাসে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত । ঢাকায় সিটিং সার্ভিস কয়টা আর কাজে সিটিং ? দিনের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলোয় – যখন চেকার বাসে উঠে – তখনই এরা ভদ্র হয়ে যায় । বাকি সময়গুলো হেল্পারদের ধান্ধাই থাকে ড্রাইভারের কোল পর্যন্ত একটা মানুষ তোলার ।

 

 ভাগ্যকে মেনে নিয়ে রাহাতও দাঁড়িয়ে ছিল ।

 এক তরুণীকে রাহাতের মতই বাধ্য হয়ে দাঁড়াতেই হয়েছে । রাহাত সীট পেলে নিশ্চয় ছেড়ে দিত । পাশের লোকটা ভীড়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছে করেই মেয়েটার কোমড়ে হাত দিচ্ছে । যদিও মুখে ফুটিয়ে রেখেছে রাজ্যের সারল্য । আর ওদিকে লজ্জায়-অপমানে মেয়েটা লাল হয়ে আছে ।

 

 হঠাৎ বাসের রড বাম হাতে ধরে ব্যালেন্স ঠিক করে ডান হাতে সপাটে ঘুষি চালায় ও অভদ্রটার মুখ বরাবর । মটমট করে একটা শব্দের সাথে মুখ থেকে রক্তের সাথে বেড়িয়ে আসে দুটো দাঁত । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা ।

‘ঘরে তোর মা-বোন ছিল না কখনও ?’ দাঁতে দাঁত পিষে বলে রাহাত । ‘মেয়েদের সম্মান করতে শেখ, ****[লেখার অযোগ্য ] ।’

বাসজুড়ে হট্টগোল পড়ে যায় । অন্যান্য যাত্রীরা উঠে সরিয়ে দেয় রাহাতকে । হেল্পার এগিয়ে আসে ।

‘তুমি হালার পো কোন এলাকার মাস্তান?’ রাহাতের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে । ‘নিরীহ একটা মানুষের মুখে এভাবে মারো?’

তাকে সায় দিয়ে ঘিরে ধরে আরও কয়েকজন ।

*

মাঝপথে থেমে যায় বাসটা । ছুঁড়ে ফেলা হয় রাহাতকে ।

 রাস্তা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় রাহাত । নাক থেকে গড়িয়ে আসা দু’ ফোঁটা রক্তের ফোঁটা হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুছে ফেলে ।

 নিস্ফল আক্রোশে লাথি দেয় রাস্তায় ।

 

 স্রেফ একটা মেয়েকে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল । অথচ কেউ সেটাকে পাত্তাই দিল না । তার কথা কেউ শোনার প্রয়োজনও মনে করল না ! কোট-টাই পড়া অমানুষটাকেই সবার ভদ্রলোক বলে মনে হল ?

আর মেয়েটা পুরো সময় ফুঁপিয়ে কাঁদছিল । ওই শালী কিছু বলতেই পারত ! ‘যার জন্য করলাম চুরি – ’ বিড়বিড় করে রাহাত ।

 

 ঘাড় মটকে চায়ের দোকানে আসে ও ।

‘মামা, পানি দেন একগ্লাস ।’

পানি রুমালে ঢেলে নাক থেকে রক্ত মোছে রাহাত । এই সময়ই প্রথম শোনে ও সুরেলা কন্ঠটা ।

‘আপনার কি বেশি লেগেছে ?’

ঘুরে দাঁড়িয়ে ও দেখতে পায় সেই তরুণীকে । ওএ বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলার সময়ই নিশ্চয় নেমে এসেছে ! মেজাজ টং হয়ে যায় রাহাতের । ‘বাস ভর্তি মানুষ যখন আমাকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছুঁড়ে ফেলছিল তখন একটা শব্দও মুখ থেকে বের হয়নি আর এখন এসেছ পিরীতির আলাপ করতে !!’ মনে মনেই খেদ ঝাড়ে ও ।

‘না ।’ মুখে কিছু বলা লাগে তাই বলে ও ।

‘আমি খুবই দুঃখিত ।’ আবার ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা । ভাল ছিচকাঁদুনের পাল্লায় পড়া গেছে – ভাবে রাহাত ।

‘আপনার দুঃখ নিয়ে আপনার পথে চলে গেলেই আমি খুশি হতাম ।’ বেশ জোরেই বলে রাহাত, ‘প্লিজ!’

 

চায়ের দোকানদার আর কাস্টোমাররা ওর দিকে তাকিয়ে আছে ।

 ভাল তো !

রাস্তায় তরুণ-তরুণীকে দেখলেই বিশেষ লুক দেওয়া হয় এই দেশে । আর এ তো নাক থেকে রক্তের ফোঁটা মুছতে থাকা তরুণের হুংকার । তাকাবে – সন্দেহ কি তায় !

গ্লাসটা দোকানে ফেরত দিয়ে সামনে হাঁটা দেয় রাহাত । ভয়ে ভয়ে গ্লাস ফেরত নেয় দোকানীও ।

 মেয়েটার দিকে একবারও ফিরে না তাকিয়ে রিকশা নেয় ও ।

 বাসায় যাওয়ার পথে একদফা নাটক হয়ে গেছে । আরেকবার বাসে উঠে ঝামেলায় যেতে চাইল না ও ।

*

কলিংবেলের শব্দ শুনেও পাত্তা দেয় না রাহাত । এই রাতের বেলা কারও আসার কথা না ।

 আর কেউ আসলেও সে এমন লাটসাহেব হয়ে যায়নি যে কলিং বেলের শব্দ শুনেই ছুটতে হবে ।

 এমনিতেই বাসায় কেউ নেই ।

 বাবা-মা আর ছোটভাইকে কয়েক মাস থেকে করা প্ল্যান অনুযায়ী গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে ও । রাহাতেরও যাওয়ার কথা ছিল – হরতালে পিছিয়ে যাওয়া সেমিস্টার ফাইনালের জন্য আটকে গেল ।

 

 আধঘন্টা পর আবারও কলিং বেল ।

 এবার একটানা চারবার ।

 বাবার পিস্তলটা হাতে নিয়ে সেফটী ক্যাচ অফ করে রাহাত । সাবধানের মার নেই । রাতের বেলা ইদানিং হামেশা ডাকাতি হচ্ছে ।

 

 দরজা খুলে হাল্কা ফাঁক করে রাহাত ।

 বিকালের সেই সমস্ত গন্ডগোলের হোতা মেয়েটা দাঁড়িয়ে ।

‘আমার বাসা খুঁজে পেলে কি করে?’ কোমড়ের পিছে পিস্তলটা লুকোয় রাহাত । বেশ রুক্ষস্বরেই প্রশ্নটা করে ।

‘আপনাকে ফলো করেছিলাম । আই অ্যাম সরি । আজ আপনার সাথে যা হল সেজন্য সত্যিই খুব খারাপ লাগছে আমার । তাও আবার আমার জন্য ।’ চেহারা দেখে মনে হচ্ছে খুবই ভয়ে আছে মেয়েটা, ‘আপনি ক্ষমা না করলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না ।’

 ‘আদর্শবতী !’ – রাগে দাঁত কিড়মিড় করে রাহাত । মুখে যদিও বলে ভিন্ন কথা –

‘আমি কিছু মনে করিনি । ওদের প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক ছিল । তোমার ব্যাপারটা আমি বুঝি । পাবলিকলি কিছু বলতে পার নি । এটা নিয়ে প্লিজ আর চিন্তা করবে না । উই আর ইভেন ।’

 ‘আসি তাহলে ?’

 ‘জ্বী – আসতে পারেন ।’ ‘তুমি’ থেকে আবার ‘আপনি’তে ডাইভার্ট হয়ে গেল রাহাত । একে খ্যাদানোটা প্রথম কথা ।

‘ওহ – বাই দ্য ওয়ে, আমি তন্বী ।’

 ‘আমি রাহাত ।’ ভদ্রতা করেও ভেতরে ডাকে না রাহাত ওকে । কাজ পড়ে আছে ।

‘আসি রাহাত ভাই । আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব আমি ।’

দরজা লাগায় রাহাত ।

*

গত কয়েকদিন ধরে সাইকোলজির ওপর একটা নতুন থিওরি নিয়ে গবেষণা করছে রাহাত । যদিও ও কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র – সাইকোলজি বিষয়টা ওর প্যাশন ।

 তন্বীকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানানোটা হয়ত ভদ্রতার দাবী রাখে – কিন্তু সারাদিনের অভিজ্ঞতা এবং নতুন গবেষণার ব্যাপারটা মিলিয়ে এতদিকে খেয়াল ছিল না ওর ।

 আবার দ্রুত ফিরে আসে রাহাত ওর রুমে ।

 

 যেখানে শেষ করেছিল চিন্তা সেখানে নিজেকে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করে ও ।

 একবার মনোযোগ নিয়ে এসে ভেঙ্গে গেলে আবার ফিরিয়ে আনাটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ।

 বেশ কয়েক মিনিট পর নিজের চিন্তায় ঢুকে পড়তেই খুট করে একটা শব্দ হয় ঘরের দরজার কাছে ।

 সেদিকে তাকিয়েই চমকে যায় রাহাত ।

 

 তন্বী এলোমেলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে ।

 ও কোনদিক দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল ?

‘তুমি এখানে কি করছ ?’ কঠোর কন্ঠে বলতে গিয়েও থেমে যায় রাহাত ।

 শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাপড় ছেঁড়া মেয়েটার ।

 হাতে একটা কিচেন নাইফ ।

 

 মুখ দিয়ে একটা জান্তব শব্দ করে রাহাতের ওপর ছুরি বাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটা ।

 বিদ্যুতবেগে গড়িয়ে সরে যায় রাহাত । বিছানায় গেঁথে যায় ছুরির ফলা ।

 টান দিয়ে বের করে আবার রাহাতের দিকে এগিয়ে আসে তন্বী ।

 

 লাথি দিয়ে চেয়ারটা ওর দিকে পাঠিয়ে দেয় রাহাত ।

 অপার্থিব একটা লাফ দিয়ে ওর সামনে চলে আসে তন্বী । কোন বাধা না পেয়ে খাটের সাথে ধাক্কা খায় চেয়ারটা ।

 এই প্রথমবারের মত আতংক অনুভব করে রাহাত ।

 মেয়েটা কি মানুষ ? একটা আহত মেয়ে কিভাবে এক লাফে চারফুট ওপরে ওঠে ?

 

জীবনবাজি রেখে ছুটে ঘর থেকে বের হয় ও ।

 পেছনে জান্তব শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসে তন্বী ।

 ডাইনিং টেবিল থেকে একটা গ্লাস ছুঁড়ে মারে রাহাত ওর দিকে ।

 স্রেফ বাতাসে ভেসে এড়িয়ে যায় মেয়েটা । বিকট শব্দে গ্লাসটা ভাঙ্গে দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে ।

 

 আর একমুহূর্ত নষ্ট না করে ছুট লাগায় রাহাত ।

 বাবা-মার ঘরে এসে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকায় । ওখানেই রেখছিল তো ?

হ্যাঁ । ভদ্র ভঙ্গীতে শুয়ে থাকা পিস্তলটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাহাত ।

 হাতে ঠান্ডা – মসৃণ বাটটার ছোঁইয়া পেতেই পেছনে দড়াম করে পুরোপুরি খুলে যায় দরজা ।

 মেয়েটার চেহারার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে , মুখ বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ছে ।

 পরের সেকেন্ডেই উদভ্রান্তের মত রাহাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তন্বী।

 পাগলের মত গুলি চালায় রাহাত ।

 

 তিনটি গুলি বেরিয়ে যাওয়ার পর লক্ষ্য করে সবগুলো মিস করেছে তাড়াহুড়োয় ।

 ছুরি ধরা হাত মাথার ওপর তোলে মেয়েটা মরণ আঘাত হানতে ।

 পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে দুইবার গুলি করে রাহাত ।

 ছিটকে পেছনের দিকে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যায় মেয়েটা । এবং পড়েই থাকে ।

 রক্তের ক্ষীণ একটা স্রোত বয়ে যায় রুমের মেঝেতে – তরলের নিম্নগামীতার সূত্র মেনে নিয়ে ।

*

রাত ১২টা ।

 রাহাতদের রোডেই খালি একটা প্লট ।

 বেলচা দিয়ে যতদূর সম্ভব নিঃশব্দে কবর খোঁড়ে রাহাত ।

 আলতো করে শুইয়ে দেয় মেয়েটাকে ।

 

 খুনটা করে ফেলার পরই তীব্র আতংক গ্রাস করে ওকে ।

 যদিও স্রেফ আত্মরক্ষার খাতিরেই কাজটা করতে হয়েছে ওকে – কিন্তু মানুষ খুন যে কাওকে স্বাভাবিক বুদ্ধি থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে ।

 নির্জন ছিল জায়গাটা । ও ছাড়া কোন সাক্ষী নেই, কেন ‘জলবৎ তরলং’ একটা ব্যাপারকে থানা-পুলিশের পর্যায়ে নিয়ে যাবে ও ?

 

লাশটাকে মাটিচাপা দিয়ে নিশ্চিন্ত হয় রাহাত । এই প্লটে আগামী বছরের আগে কাজ শুরু হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই – জানে রাহাত । তারপর কংকাল উদ্ধার করে ছাই করে ফেলবে পুলিশ ।

 বাসার দিকে ক্লান্ত পায়ে ফিরে চলে ও । রক্তের দাগ পরিষ্কার করতে হবে ।

*

এখানেই পুরো ঝামেলা শেষ হতে পারত – কিন্তু শেষ হওয়ার পরিবর্তে বেড়েই চলল তা ।

 পরদিন সকালে নাস্তা করতে বের হয় রাহাত ।

 বাবা-মা না থাকলে নাস্তাটা বাইরেই সারে ও ।

 রাস্তায় পা রাখতেই ওপাশ থেকে হেঁটে আসে তন্বী ।

 

 তীব্র আতংকে জায়গাতে জমে যায় রাহাত ।

 হাসিমুখে ওকে পাশ কাটিয়ে রাস্তা দিয়ে মেয়েটা হেঁটে যায় উল্টোদিকে ।

 মাথা দুই হাতে ঢেকে বসে পড়ে রাহাত ।

 

 চারদিকে ঝলমলে দিনের আলো । এর মাঝে এসব ব্যাখ্যাহীন কিছু দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না ও মোটেও ।

 আধঘন্টা পর নিজেকে বোঝায় ও – তন্বীর মত দেখতে কেউ ছিল ওটা । মনের জোর একত্র করে নাস্তা সেরে আসে ।

 রোডের শেষ মাথায় স্পষ্টই তন্বীকে দেখে রাহাত । ছুটে যায় এবার ও বেপরোয়া হয়ে ।

 কিন্তু আগেই সরে যায় তন্বী । রোডের শেষ মাথায় পৌঁছে দুইপাশে কাওকে দেখে না ও ।

*

এক মাস পেরিয়ে গেছে ।

 প্রথমদিকে দূরে দূরে দেখত ও মেয়েটাকে । কিন্তু যত দিন যাচ্ছে কাছে আসছে ওটা ।

 রাতে কিংবা দিনে এখন বাড়ির ভেতর দেখতে পায় রাহাত মেয়েটাকে ।

 

 সেদিন স্বপ্নে দেখে ওর সাথে তন্বীর বিয়ে হয়ে গেছে ।

 থাইল্যান্ডে ঘুরতে এসে নৌকা ভ্রমণে বেড়িয়েছে ওরা । হাসিতে মুখর নবদম্পতির প্রমোদতরী ।

 পাশ দিয়ে আরেকটা নৌকা চলে যায় – তাতে এক মা দাঁড়িয়ে আছে তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে । স্বামীপ্রবর কিন্তু ঠিকই হাত নাড়ে । রাহাতও হাত নেড়ে সায় দেয় ।

 হিস হিস শব্দে ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হয় রাহাত, ‘আমার ওরকম একটা বাচ্চা থাকতে পারত । তোর জন্য শুধু …’ জান্তব শব্দ করে এরপর মেয়েটা । নৌকার একাংশ ভেঙ্গে তার সাথেই পানিতে তলিয়ে যায় ও ।

 নৌকার বাকি অংশও ডুবে গেলে পানিতে পড়ে বৃথায় হাত-পা ছুঁড়ে রাহাত । সাঁতার পারে না ও ।

 দম আটকে আসায় হাত পা ছোঁড়ে – আর ঘুমটা তখনই ভেঙ্গে যায় ওর ।

 

 চোখ খুলতেই দেখতে পায় তন্বীকে । ওর গলা দুই হাতে টিপে ধরেছে ।

 জিহবা কিছুটা বের হয়ে আছে ওর । দুই চোখে জীঘাংসা ।

 হঠাৎ মা লাইট জ্বালান ।

‘কি হয়েছে বাবা তোর ? চিৎকার করছিস কেন?’ লাফ দিয়ে বসে রাহাত ।

 তন্বী নেই কোথাও ।

*

তন্বীর সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা থেকে সব কিছুই খুলে বলে রাহাত এক নাগাড়ে ।

 ড. সাদেক মন দিয়ে শোনেন ।

 ড. সাদেক সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টাল হেড । বাংলাদেশের সেরা সাইক্রিয়াস্টিকদের মধ্যে অন্যতম ।

 

 রাহাতের এখন ফাঁসীর দড়ি গলায় নিতেও আপত্তি নেই – ও শুধু মুক্তি চায় এই বিভীষিকার হাত থেকে ।

 সব শুনে রাহাতের চোখের দিকে তাকান ড. সাদেক ।

‘রাহাত – তোমার ব্যাচমেট মিথিলার সাথে তোমার ঠিক কি ধরণের সম্পর্ক ছিল?’

 ‘স্যার?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে রাহাত ।

‘আমার কাছে লুকালে তোমাকে আমি কিভাবে সাহায্য করব বল ?’

কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে রাহাত । তারপর মুখ খোলে, ‘আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম ।’

 ‘মিথিলার সুইসাইডের কারণ তুমি জানতে রাহাত?’ তীরের মত পরের প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন ড. সাদেক ।

 চুপ করে থাকে রাহাত ।

 

 বাধ্য হয়ে আবারও মুখ খোলেন ড. সাদেক –

 ‘দেখ, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সাইক্রিয়াস্টিক বলা হয় আমাকে । কেন, জানো ? আমি প্রতিমুহূর্তে দেখা মানুষের মনের অবস্থা নিয়ে ভেবে যাই । এখন অনেক কিছুই বুঝে ফেলাটা আমার মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে । তুমি বা মিথিলা কাওকে কিছু না বললেও অনেক কিছুই আমি জানি – যেটা আর কারও জানার কথা না । কিন্তু বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হলে আমার তোমার সাহায্য দরকার । এবং কেবল এভাবেই তোমাকে সাহায্য করা সম্ভব আমার পক্ষে ।’

মিনিট দুয়েক চুপ থেকে তাকায় রাহাত, ‘মিথিলা অন্ত্বঃসত্তা ছিল । আমার সন্তান নিয়ে । ওটা ছিল একটা অ্যাকসিডেন্ট । কিন্তু তখন আমরা কেবল সেকেন্ড ইয়ারে । বিয়ের ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য বলে মিথিলা আমাকে । আমি …’ চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি মোছে রাহাত ।

‘আমি ফিরিয়ে দেই ওকে সেদিন । পরদিন শুনি আত্মহত্যা করেছে মিথিলা ।’

 

 ‘তোমার বাসায় যাওয়া যাবে এখন, রাহাত ?’ প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে ফেলেন ড. সাদেক ।

*

বাবা-মা দুইজনই অফিসে । ছোট ভাইটা স্কুলে ।

 বাসা খালি দেখে স্বস্তি পায় রাহাত ।

‘তোমার বাবা-মার ঘরে নিয়ে চল আমাকে ।’ ভেতরে ঢুকেই বলেন ড. সাদেক ।

 ঘরটায় ঢুকে চারপাশে তাকান তিনি । বুকশেলফটা দেখেন । দেওয়ালগুলো খেয়াল করেন কাছ থেকে । তারপর ফিরে আসেন ড্রইং রুমে ।

 

‘রাহাত – তোমার সিজোফ্রেনিয়া আছে । এটা অডিটরি এবং ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশনের সমন্বয় । যা আসলে ঘটছে না – এমন কিছু দেখতে পাও তুমি – শুনতে পাও । তোমার মস্তিষ্কের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এটা । ’

 ‘স্যার আমি জানি সিজোফ্রেনিয়া কি। কিন্তু আপনি কিভাবে -’

 ‘মিথিলার ঘটনায় তুমি ভয়ানক আপসেট ছিলে । নিজেকে শাস্তির যোগ্য মনে করেছিলে । মিথিলা কোন নোট রেখে যায় নি । পোস্ট মর্টেমে তার পরিবার রাজি হয় নি । তুমিও মুখ খোল নি । কেউ জানে না আসলে মিথিলার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী । এজন্যই তন্বী নামের কাল্পনিক মেয়েটা তোমাকে স্বপ্নে সন্তানের কথা বলে অভিযোগ করে । এবং এখন পর্যন্ত তোমাকে বিরক্ত করে আসছে । এটা তোমার নিজেকে দেওয়া নিজের পক্ষ থেকে শাস্তি ।’

 

 ‘আমি নিজের হাতে গুলি করি তন্বীকে । ওকে একটা পশুর মত পুঁতে রাখি খালি প্লটে । ওর মৃত্যুর পর আমি যা দেখি তা সিজোফ্রেনিয়া হতেই পারে । কিন্তু স্যার আমি তন্বীর মৃত্যুর জন্য দায়ী । ’

 ‘না, রাহাত । তন্বী বলে কোন মেয়ের সাথে তোমার পরিচয় হয়নি । বাসের কেউ তোমার কথায় কান দেয় নি । চায়ের দোকানদার তোমার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল । কারণ – তুমি বাতাসের সাথে কথা বলছিলে তখন ।’

 ‘অসম্ভব – আমি ওকে গুলি করি …’

 ‘তুমি বলেছ – তুমি গুলি করেছিলে পাঁচবার । শেষ দুইবার লাগাতে পেরেছ । ’

 ‘এক্স্যাক্টলি, স্যার !’

 ‘অথচ বুকসেলফে পাঁচটা বুলেটই গেঁথে থাকতে দেখলাম আমি । বলতে চাও দুইটা গো-থ্রু উয়ন্ড একটা মেয়েকে ইন্সট্যান্টলি মেরে ফেলতে পারে ? বুলেটে কথা বাদ দাও – তোমার ছোঁড়া গ্লাস অথবা চেয়ার কোনটাই নাগাল পায়নি মেয়েটার ।’

 ‘তাহলে স্যার – আমি তন্বী – মানে খুনটা করিনি ?’ বিশাল বোঝা নেমে যায় রাহাতের বুক থেকে।

‘না ।’ মুচকি হাসেন ড. সাদেক, ‘আর মিথিলার ব্যাপারে তুমি যথেষ্ট অনুতপ্ত । আমি মনে করি সত্যটা আমাদের দুইজনের মধ্যেই চাপা থাকতে পারে ।’

*

রাত ১২টা ।

 রাহাতের বর্ণনা অনুযায়ী খালি প্লটটায় চলে আসেন ড. সাদেক ।

 কৌতুহলই তাকে টেনে আনে । সকালে রাহাতকে দেওয়া ব্যাখ্যাটার সত্যতা জানার একটাই উপায় ।

 

 বেলচা চালিয়ে নিঃশব্দে খুঁড়ে যান ড. সাদেক ।

 নরম কিছুতে বেলচা পড়তেই থমকে যান ডক্টর ।

 

 আধপচা মেয়েলি একটা হাতের দিকে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ড. সাদেক ।

 

Image

Advertisements

৫ । হিমানন্দ

Standard

লাশটার দিকে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাফা । 

 বিশ্বাসঘাতকটাকে দেখে ওর ভেতরে কোন অনুভূতি আসার কথা না । আসেও নি । কিচেন নাইফটা বুকে আমূল ঢুকিয়ে দিতেই ধড়মড় করে পড়ে গেল শিশির । হাত বাড়িয়ে কিছু একটা ধরতে চাইছিল বোধহয় । প্রবল ঘৃণায় এক পা পিছিয়ে এসেছিল রাফা ।

 Image

 কলিং বেলের শব্দ ।

 মাথা গরম করলে চলবে না । টেনে শিশিরের শরীরটা সোফার নিচে ঢুকিয়ে দিল ভাল মত ।

‘আসছি!’ একটা চিৎকার ছুড়ে ও বন্ধ দরজার উদ্দেশ্যে । শিশির যেখানে পড়েছিল সেখানে রক্তের ছাপ ।

 ওটা মোছার সময় নেই । ফ্রিজ থেকে একটা কেচাপের বোতল তুলে দরজার দিকে ছুটল ও ।

 

 এষা বাইরে থেকে একটা বোতল ভাঙ্গার শব্দ শুনে । তারপরই দরজা খুলে দেয় রাফা ।

‘দোস্ত তোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি কতক্ষণ ।’ দুঃখপ্রকাশের ভঙ্গী করে রাফা । ‘কিচেনে ছিলাম ।’

 ‘আহা – তাই বলে এভাবে দৌড়ে আসবি ? ঘরবাড়ি ভাঙ্গার স্বভাব তো যায় না তোর । ’ ড্রইং রুমের মাঝে কেচাপের ভাংঙ্গা বোতলের দিকে তাকিয়ে হাসে এষা ।

‘বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলবি – ভেতরে আয় তো !’

 ‘না রে । ভার্সিটির দেরী হয়ে যাচ্ছে । তুই তোর ডিভিডিগুলো ধর । অস্থির ছিল !! ড্যান ব্রাউনের কোন বইটা জানি দিতি আমাকে ? ওটা দৌড় দিয়ে নিয়ে আয় তো।’

 ‘আনছি ।’ হাত বাড়িয়ে ডিভিডিগুলো ধরে রাফা । ‘তুই বস তো ।’

 

বেডরুম থেকে বইটা নিয়ে ফিরে এসেই রাফা দেখল এষা ঠিক শিশিরের ওপরে বসে আছে, এষার পায়ের দুই ইঞ্চি দূরেই শিশিরের হাতের আঙ্গুল । কানে ইয়ারফোন ছিল এষার । গানের তালে তালে মেঝেতে পা ঠুকে চলেছে । ঢোক গেলে রাফা । পা আর দুই ইঞ্চি সরে গেলেই আর দেখতে হবে না ।

 রাফাকে দেখে থেমে গেল এষার পা ঠোকাঠুকি ।

 

‘আংকেল কবে আসবে রে ?’ কান থেকে ইয়ারফোন খুলে বইটা হাতে নেয় এষা ।

‘আগামী সপ্তাহে হয়ত । ’

 ‘ওক্কে দেন । থাক তুই । আমি দৌড়ালাম । দেরি হয়ে যাচ্ছে ।’

দরজা লাগিয়ে হাঁফ ছাড়ে রাফা । বাঁচা গেল ।

*

রাফার মা নেই । বাবা ব্যাবসায়িক কাজে সিংগাপুর গেছেন কয়েকদিন আগে ।

 বাসায় রাফা ছিল একা। মাত্র ছয়দিন আগে ব্রেক-আপ হয় ওর শিশিরের সাথে ।

 

 পাঁচ বছরের রিলেশনের পর বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেয়া যায় না । শিশির রিয়ার সাথে গত একমাস ধরে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে সেটা শুনেও বিশ্বাস করেনি রাফা । হাতে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ আসার পর ব্রেক-আপ করে ও শিশিরের সাথে । শিশির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল । কিন্তু শোনার প্রয়োজন বোধ করেনি ও ।

 তাতে অবশ্য বুকের জ্বালা নেভে নি রাফার । তাকেই কেন মেনে নিতে হবে সবকিছু ?

মুক্ত বিহঙ্গের মত যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াবে শিশির । অন্যায় মেনে নিতে হবে রাফাকে ।

 গতকাল রাতে শিশিরের ফোন প্রথমবারের মত ধরে রাফা । শিশির অবাক হয় ওর বাসায় এসে কথা বলার আহবানে ।

 ইনিয়ে বিনিয়ে অসুস্থতার বর্ণনা দেয় রাফা ।

 

 ঘরে ঢুকে দরজা লাগানোর পর আর বেশি দেরী করেনি ও । বিশ্বাসঘাতকটাকে জীবিতদের কাতার থেকে একরকম আউট-ই করে দিয়েছে । কোনরকম অনুশোচনা তার মধ্যে কাজ করছে না । সোফার নীচ থেকে শিশিরের মৃতদেহটা বের করে আনল । মরার পরও শয়তান শয়তান একটা হাসি লেগে আছে শিশিরের মুখে – অন্তত রাফার সেরকমই মনে হল ।

 

 একটা শয়তানকে মেরে ফেলার জন্য জেলে যেতে পারবে না রাফা । এই মরাটাকে স্রেফ ভ্যানিশ করে ফেলতে হবে ।

 অনেক কষ্টে টেনে মৃতদেহটা বাথটাব পর্যন্ত নিয়ে যায় রাফা ।

 রান্নাঘর থেকে ছুড়ি আর মীট ক্লেভারটা নিয়ে আসে ।

*

চারদিন পর ।

 কলিং বেলের শব্দ ।

 দরজা খুলে ধূর্ত চেহারার একজন মাঝবয়েসী লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ।

 

‘ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত । আপনি কি মিস রাফা? ’ চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ।

 সায় দিতেই বলে ওঠে আবারও, ‘আমি আসিফ জামান । প্রাইভেট ডিটেক্টিভ । ব্যাপারটা আপনার এক্স-বয়ফ্রেন্ড শিশিরকে নিয়ে । ভেতরে আসতে পারি ।’

 ‘নিশ্চয় ।’ এখানে বাধা দিয়ে সন্দেহ বাড়িয়ে দিতে চায় না রাফা । ‘ তবে শিশিরের ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই । দশদিন আগে থেকে ওর সাথে ব্রেকআপ’

 ‘মি. শিশির গত চারদিন ধরে নিখোঁজ । ’ ভ্রু কুঁচকে সরাসরি রাফার দিকে তাকায় আসিফ। ‘এ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন?’

 ‘ওর নিখোঁজ থাকায় আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই ।’ মুখের ওপর বলে দিল রাফা। ‘তবে, শুধু মাত্র প্রসঙ্গক্রমে বলছি ওকে কয়েকদিন আগে আমার বাসায় আসার জন্য ফোন দিয়েছিলাম বটে । কিন্তু ও আসে নি । আসলেও বলার কিছু থাকত না ওর । তাই উপেক্ষা করেছে কাওয়ার্ডটা । ’

 ‘কিন্তু আপনার বাসা থেকে মাত্র একশ গজ দূরে উনার গাড়ি পার্কড গত চারদিন ধরে । আপনি বলতে চাইছেন এ ব্যাপারে কিছু জানেন না আপনি ?’

 ‘আপনাকে আমি বলেছি ও আমার বাসায় আসেনি ।’

 ‘উড ইউ মাইন্ড ইফ আই চেক?’ পারমিশনের ধার না ধেরে উঠে পড়ে প্রাইভেট ডিটেক্টিভ ।

 

 তারস্বরে আপত্তি করতে করতে পিছে পিছে ছুটে রাফা । কান না দিয়ে সবগুলো ঘর ঘুরে আসে বিচ্ছু ডিটেকটিভ । বাথরুমগুলোতেও উঁকি দেয় । অবশেষে ফিরে আসে ড্রইং রুমে । ডিটেকটিভের মুখের দিকে ধরে চামচ নাচায় রাফা রাগে ।

‘আর ইউ হ্যাপী নাউ ? আপনাকে বাসার ত্রি-সীমানায় দেখলে আমি পুলিশ ডাকব এর পরে । কথাটা মাথায় রাখলে খুশি হব ।’

 

দড়াম করে দরজা লাগায় ও ।

*

শিশিরের পুরো শরীরটা টুকরো টুকরো করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখতে সারা রাত পেরিয়ে যায় সেদিন রাফার । ছোট ছোট পলিব্যাগে করে রাখায় দেড় দিনের মধ্যে শক্ত হয়ে যায় ওর শিকার ।

 

 পরের দুই দিনে মোট ছয়বার বেরিয়ে বিভিন্ন ডাস্টবিনে ডাম্প করে রাফা শিশিরের দেহাবশেষ ।

 আর দুইবার বের হলেই কাজ শেষ হয়ে যেত ওর । এই সময় বেয়াদব ডিটেকটিভের আবির্ভাব , সন্ধ্যার পর আজই আরেকবার বের হতে হবে – ঠিক করে রাফা ।

 

 ওই ব্যাটা ঘাঘু লোক । এর পরের বার ভালো মত সার্চ করবে । আজ রাতের প্রথম কাজ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে রক্তের ছাপ সম্পূর্ণ দূর করা ।

*

আসিফ জামান এ লাইনে নতুন । তবে প্রথম পাঁচটি কেসেই অভাবনীয় সাফল্যে তার নাম ডাক ভালই ছড়িয়েছে ।

 বাসায় এসেও মাথা থেকে ব্যাপারটা সরাতে পারছে না ও ।

 শিশির নামক ছেলেটার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কেসটা অনেক বোরিং মনে হলেও টাকার অংক ফেলনা ছিল না । কাজেই হাতে নেয় ও ।

 

 শিশিরের ব্যাকগ্রাউন্ড সুবিধের না । ড্রাগসের ব্যাপারে হালকা পাতলা কানেকশান দেখতে পেয়েছিল আসিফ । তবে এই এক্স-গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারটা ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে ব্যাপারটা ।

 আসিফের মনে বদ্ধমূল হল ধারণা – খুন হয়ে গেছে শিশির ।

 সাত দিনেও দেহ উদ্ধার করা না যাওয়ায় অফিশিয়ালি স্বীকার করা হচ্ছে না যদিও । খুবই ধূর্ততার পরিচয় দিয়েছে কেউ ।

 নো বডি – নো ক্রাইম – কথাটার সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আসিফ ।

 

‘চা বানিয়েছি । দেব তোকে ?’ দরজা থেকে জানতে চাইলেন মা ।

‘দাও মা । চিনি বেশি দেবে না কিন্তু ।’

আবার গভীর চিন্তায় ডুবে যায় আসিফ ।

 এই সময় কিছু একটা মনে পড়ায় সোজা হয়ে বসে পড়ে ও ।

 মার চামচ হাতে ফ্রিজ খোলার দৃশ্য মাথায় এনে দেয় আইডিয়াটা ।

‘দেয়ার ওয়াজ দ্যা বডি ।’

উদ্ভাবনার আনন্দে চোখ চকচক করে ওঠে আসিফের ।

 

‘মা, বের হচ্ছি আমি । এসে তোমার চা খাব ।’

ছুট লাগায় আসিফ ।

*

ছুড়ি আর হাড্ডি কোপানোর দাটা ভালো মত ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধোয় রাফা ।

 এগুলোর কাজ শেষ ।

 রিপ্লেসমেন্ট কিনে কিনে ফেলে দেওয়া যাবে ওগুলোও ।

 কলিং বেল বেজে ওঠে এসময় ।

 

 দরজা খুলে হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে রাফার চেহারা, ‘বাবা ! একটা ফোনও তো দিতে পারতে ?’

 ‘সারপ্রাইজ, মামণি ।’ সম উচ্ছ্বাসেই বলেন মি. ইমতিয়াজ ।

 বাবার সাথে কথা বলতে বলতে আড়চোখে একবার ডীপ ফ্রীজের দিকে তাকায় রাফা । ছোট ছোট পিসে আস্ত প্রাইভেট ডিটেকটিভটাই ঢুকে আছে ।

 

 বাবাকে না বুঝতে দিয়ে আগামী কয়কটা দিন ঘন ঘন বের হতে হবে ওকে ।

৪ । গুডবাই

Standard

স্নিগ্ধার হাত ধরে কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকে রিয়াদ । 

 

 আজ রিয়াদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর বড়ভাইয়ের বিয়ে । চারপাশ নানারকম আলোয় ঝলমলে ।

 ওদের দূর থেকেই দেখে ফেলে বন্ধু রাশেদ । এগিয়ে এসে উষ্ণ সম্ভাষণ জানায় ।

‘কিরে ! ভাইয়া তো ঝুলে গেল ।’ স্বভাবসুলভ হাসিখুশি মুখ নিয়ে বলে রাশেদ । ‘তোরা ঝুলবি কবে?’Image

লজ্জিত হাসি দেয় স্নিগ্ধা ।

‘সামনের বছর, যদি আল্লাহ সব কিছু ঠিক রাখে, দোস্ত ।’ একটু হেসে বলে রিয়াদ । ‘চল, ভাইয়ার সাথে একটু টোকাটুকি করে আসি ।’

হঠাৎ-ই হাসিটা ম্লান হয়ে যায় রিয়াদের মুখ থেকে ।

 

 ওটা তৃণা না ? আরেকটা ছেলের হাত জড়িয়ে থাকতে দেখে ঈষৎ ঈর্ষার খোঁচা অনুভব করে ও বুকের ভেতর । তার থেকেও বেশি জ্বলে ওর ছেলেটার চেহারা দেখে । এই ব্যাটা দেখি একেবারে টম ক্রুজের বাংলাদেশি ভার্সন !

রাশেদদের দিকেই এগিয়ে আসছে ওরা ।

 

‘হেই রাশেদ !’ কাছাকাছি এসে ডাক দেয় ছেলেটা । ‘তরুণ ভাই আটকে গেছে । ভার্সিটিতে সমস্যা ওদের ।’

 ‘ড্যাম !’ ঘুরে দাঁড়ায় রাশেদ । ‘বেরিয়ে চলে আসতে বল । দাঁড়াও আমিই ফোন দিচ্ছি ।’

 ‘উঁহু – ভার্সিটিতে ভয়ানক আন্দোলন চলছে । ভিসি অপসারণের দাবীতে । ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে পরিবেশ । ছাত্র কল্যান উপদেষ্টা হিসেবে উনি পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন । উনার ঘন্টা দুই দেরী হতে পারে ।’

 ‘কি আর করা ।’ মন খারাপ করে বলে রাশেদ । তরুণ ভাই কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় – জানে রিয়াদ ।

 

 হঠাৎ মনে পরে যাওয়ায় বিব্রত হয় রাশেদ । ‘এই যাহ – পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় নি তোদের ।’ রিয়াদদের বলে ও, ‘কাজিন রেজা এবং হবু ভাবী তৃণা । রেজাকে চিনছ তো ? আর&টি গ্রুপ অফ ইন্ড্রাষ্ট্রিজটা ওরই ।’

 ‘হবু ভাবী?’ কখন যে জোরে উচ্চারণ করে ফেলে রিয়াদ – নিজেই খেয়াল করে না ।

‘বাগদত্তা ।’ ছাগলের-মত-প্রশ্ন-করিস-কেন টাইপ লুক দেয় রাশেদ ।

 

 একটানে পাঁচ বছর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় রিয়াদকে কিছু স্মৃতি ।

*

তৃণাকে প্রথম দেখে ও ওদের ইউনিভার্সিটির ফ্রেশারস ওয়েলকাম পার্টিতে ।

 অসাধারণ সৌন্দর্য আর মার্জিত একটা উপস্থাপনা – এই দুটো জিনিসই প্রধানতঃ আকর্ষিত করে রিয়াদকে ।

 ইলেক্ট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী তৃণা । রিয়াদ কম্পিউটার সাইন্সে ।

 

 দূরত্বটা কমিয়ে ফেলার পেছনে ভার্সিটির সবাই কৃতিত্ব দিবে রিয়াদকে । রিয়াদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার কাহিনী ভার্সিটির সব ব্যাচের স্টুডেন্টের কাছেই স্বীকৃত ছিল । অবশেষে দেবীর দয়া হল । আগস্টের আঠার তারিখ তৃণা সম্মতি জানায় রিয়াদকে ।

 রিয়াদের জন্য পরের সাড়ে তিনটি বছর ছিল স্বর্গবাসের অভিজ্ঞতা । একসাথে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া, ছুটির দিনগুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুরে বেড়ানো, সন্ধ্যারাতে ছাদে উঠে গালে গাল ঠেকিয়ে চাঁদ দেখা আর মাসে একবার করে নৌকা ভ্রমণ । পরীক্ষার আগে একজন আরেকজনকে গাইড দেওয়া – কমন কোর্সগুলোর ক্ষেত্রে গ্রুপ স্টাডি – মানে কি একাডেমিক, কি পার্সোনাল – রিয়াদের জীবন তৃণাময় ছিল ।

 

 কিছুটা সমস্যা যে ছিল না তাও নয় – প্রথম একটা বছর আবেগে অন্ধ হয়ে থাকলেও তার পর থেকে ভবিষ্যৎ ভেবে মাঝে মাঝেই চিন্তিত না হয়ে পারত না রিয়াদ ।

 রিয়াদের বাবা একজন শিল্পপতি । সমাজের উচ্চস্তরের লোকজনের সাথে তাঁর উঠাবসা । অপরদিকে তৃণার বাবা সামান্য একজন স্কুলশিক্ষক । ন্যায়-নীতি ; মান-মর্যাদার কথা বিবেচনা করে সমাজ তাঁকে অনেক ওপরে স্থান দিতে পারে – কিন্তু নিজের বাবাকে চেনে রিয়াদ । তাঁর পুত্রবধূর পরিচয় দিতে তিনি ‘স্কুলশিক্ষকের’ মেয়ের প্রসঙ্গ কোনদিনই মেনে নেবেন না । স্ট্যাটাস মেইনটেইন করে চলেন তিনি । সমাজের মানদন্ড তাঁর কাছে অর্থ এবং শিক্ষা উভয়ই । পাল্লার দিকে অর্থই হয়ত একটু বেশি ভারী । আত্মীয়তা করার আগে অবশ্যই তিনি ক্লাস এবং স্ট্যাটাসের দিকে নজর দেবেন । তৃণার বাবা যেই মানদন্ডে কোনভাবেই রিয়াদের বাবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে না ।

 

 তারপরেও দিন তো চলে যাচ্ছিল ! যতদিনে না থার্ড ইয়ার সেকেন্ড সেমিস্টারে উঠে ইন্টার-ইউনিভার্সিটি কম্পিটিশনে অংশ নেয় রিয়াদের গ্রুপ । কম্পিটিশনে রিয়াদদের প্রজেক্টই ফার্স্ট হয় – তবে রিয়াদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় কম্পিটিশনটাই । রানার্স আপ গ্রুপের লিডারের দিকে চোখ আটকে যায় রিয়াদের । মেয়েটার কথা বলার মধ্যে আধুনিকতার একটা ছাপ ছিল যেটা তৃণার মাঝে কখনও পায়নি ও । পরিচিত হতে দেরী করে না রিয়াদ । মেয়েটার নাম স্নিগ্ধা ; দেশের প্রথম সারির প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ।

 

 ওখান থেকেই শুরু হয় ওদের বন্ধুত্ব । তৃণার জন্য সময় কমে আসতে থাকে রিয়াদের । স্নিগ্ধাকে তৃণার ব্যাপারে কখনো কিছু জানায় নি রিয়াদ । তাছাড়া স্নিগ্ধার বাবার অবস্থান রিয়াদের বাবার থেকেও একধাপ ওপরে কি না!

একদিন ফোনে তিক্ততার চরমে পৌঁছে যায় রিয়াদ-তৃণার সম্পর্ক । তখন রিয়াদ-স্নিগ্ধা হাতিরঝিলে । স্নিগ্ধা থেকে একটু সরে এসে রিসিভ করে রিয়াদ ।

 

‘হ্যালো ! রিয়াদ তুমি পাইছটা কি বল তো?’ আহত বাঘিনীর মত হুংকার দেয় তৃণা ।

‘কি হয়েছে ? চিল্লাচ্ছ কেন?’

 ‘তোমার আজ বিকালে আমার সাথে দেখা করার কথা ছিল না ?’

 ‘ও হ্যাঁ, হঠাৎ নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ পড়ে গেল তাই আসতে পারি নি ।’

 ‘আমাকে দুধের শিশু পাইছ? তুমি ক্যাম্পাস থেকে ওই ডাইনিটার সাথে বের হয়েছ – কি ভেবেছ কিছুই খোঁজ খবর রাখি না আমি ??’

 ‘মুখ সামলে কথা বল ।’ হঠাৎ-ই মেজাজ চড়ে যায় রিয়াদের ।

‘আমার সাথে তুমি এভাবে কথা বলছ একটা প্রস্টিটিউটের জন্য ? ওর জামাকাপড়ের অবস্থা দেখছ ?’

 ‘শাট আপ!’ চোখ জ্বলে ওঠে রিয়াদের, চিবিয়ে চিবিয়ে তৃণাকে বলে ও, ‘শা-ট আ-প ! একটা ভদ্রঘরের মেয়ের ব্যাপারে এভাবে কথা বলা তোমার মত মেয়ের মুখে সাজে না । ইটস ওভার, তৃণা । আর কোনদিন আমার সাথে কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করবে না । ইউর রিয়াদ ইজ ডেড !’ কচ করে লাইনটা কেটে দিয়ে স্নিগ্ধার কাছে ফিরে আসে ও ।

‘সরি – নতুন প্রজেক্টের ব্যাপারে ফোন দিয়েছিল ফ্রেন্ড ।’ বিনীত একটা হাসি দিয়ে বলে রিয়াদ ।

 

 নিজের ইগো ছুঁড়ে ফেলে তৃণা বার বার ক্ষমা চায় রিয়াদের কাছে । স্নিগ্ধার ব্যাপারে করা মন্তব্যের জন্য স্নিগ্ধার কাছে ক্ষমা চাইতেও তার আপত্তি নেই – রিয়াদকে শতবার জানালেও কান দেয় না ও । ততদিনে রিয়াদ – স্নিগ্ধার সম্পর্ক আরও এগিয়েছে কি না ।

 

 অসহায় মেয়েটা এক রাতে এক পাতা স্লিপ পীল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে । বডি রিজেক্ট করে অতিরিক্ত পয়জন । মেডিকেলে রাখা হয় তৃণাকে এক সপ্তাহ । রিয়াদ কিছুই জানতে পারে না । যে রাতে আত্মহত্যার পথই তৃণার কাছে স্বর্গীয় লেগেছিল সে রাতেই রিয়াদ প্রপোজ করছিল স্নিগ্ধাকে । রিলেশনের এক বছরের মধ্যেই বাবাকে তাদের সম্পর্কের কথা জানাতে দ্বিধা করতে হয়নি রিয়াদকে – যে স্থান তৃণা সাড়ে তিনটি বছরেও পায়নি ।

 

 দিন – মাস – করে বছরও পেরিয়ে যায় দুইটি । তৃণা স্মৃতি স্নিগ্ধার আড়ালে হারিয়ে যায় পুরোপুরি ।

*

আজ আবার তৃণাকে সামনে দেখে সব কিছু ওলোট-পালোট হয়ে গেল রিয়াদের । এই কয় বছরে মেয়েটা আরও সুন্দর হয়েছে । স্নিগ্ধাও যথেষ্ট সুন্দরী – কিন্তু আধুনিক পোশাক ছাড়া স্নিগ্ধার সৌন্দর্য্য ম্লান হয়ে যায় – লক্ষ্য করেছে রিয়াদ ।

 

 অথচ তৃণার দিক থেকে বেচারার চোখ সরাতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে । বাঙ্গালী মেয়ের মত শাড়ি পরেই আজ এখানে এসেছে তৃণা – তাতে যেন ওর রূপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে । আর ঘুরছে কার সাথে দেখো ! আর&টির মালিকের সাথে – সবচেয়ে অল্পবয়সী ধনীদের একজন যে বাংলাদেশে । যে তৃণাকে স্ট্যাটাসের দোহাই দিয়ে একদিন দূরে ঠেলে দিয়েছিল সে এখন তার থেকে দেখতে এবং বিত্তে কয়েকগুণ ওপরের স্তরের ছেলের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে – দৃশ্যটা অসহ্যকর লাগে রিয়াদের ।

 

 একটা টেবিল জুড়ে বসে রাশেদ, তৃণা , রিয়াদ আর স্নিগ্ধা । রেজা তখন পরিচিত এক বন্ধুর সাথে কথা বলতে উঠে গেছে ।

 কথা যা বলার ওরা তিনজনই বলছে । রিয়াদ হয়ে গেছে পাথরের মূর্তি ।

 অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না ।

‘আমি-ই ওকে ডাম্প করি । দ্যাট ওয়াজ মি !!’ নিজেই নিজেকে বোঝায় ও । কিন্তু কাজ হয় না ।

‘স্নিগ্ধা ভাবীকে তো আপুর সাথে পরিচয় করানোই হল না !’ হঠাৎ মনে পড়ে রাশেদের । ‘তোরা কথা বল । আমরা আপুর সাথে কথা বলে আসি ।’

 

তৃণা আর রিয়াদ একা এখন । দীর্ঘ দুই বছর পরে ।

‘কেমন আছ তুমি ?’ প্রশ্ন করে রিয়াদ ।

‘ভালো ।’ এতটুকুতে যেন প্রকাশ করতে পারে না তৃণা, ‘জীবনের সবচেয়ে ভালো সময় পার করছি । রেজার মত লাভিং একটা হাজব্যান্ড থেকে বড় চাওয়া একটা মেয়ের আর কি হতে পারে । ওকে দেখে গোমড়া মুখো মনে হচ্ছে না ? আসলে কিন্তু তা না । ভীষণ মজার মানুষ ।’ মুক্তোর মত দাঁত বের করে হাসে তৃণা । সুখী মানুষের হাসি । হঠাৎ লজ্জা পায়, ‘দেখেছ – নিজের কথাই বলে যাচ্ছি ! তোমার কি খবর । শুনলাম তোমাদের নাকি সামনের বছর বিয়ে ? তোমাদের দেখলেই এত হ্যাপী মনে হয় – জানো ? ’

 

ঠিক আধঘন্টা পর স্নিগ্ধাকে নিয়ে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠে রিয়াদ । রাশেদের সাথে যথেষ্ট খারাপ ব্যাবহারও করে । যথেষ্ট হয়েছে ওর জন্য । পাশের সীটে বসে থাকা স্নিগ্ধাকে রীতিমত বিরক্ত লাগছে এখন ওর ।

 তার ওপর কালকে আঠারোই আগস্ট ।

 আজকের চাঁদটা সুন্দর । আকাশেও মেঘ নেই ।

 গাড়ির জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে রিয়াদ – ‘হ্যাপী অ্যানিভার্সারি তৃণা’

 

*

ভেতরে একা বসে থাকে তৃণা । বিষন্ন মুখ । রেজা এসে মুখোমুখি বসে । বুলেটের মত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় –

‘তাহলে এই ছেলের সাথেই প্রেম করতি তুই ইউনিভার্সিটি লাইফে ?’

 ‘হুঁ’

 ‘এই শালা তো টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না – তোর কপাল ভালো – এটাই বলব আমি ।’

রাশেদ এসে যোগ দেয় ।

‘অসাধারণ অভিনয়, ইমরান ভাই!!’ পিঠ চাপড়ে দেয় রেজা ওরফে ইমরানের ।

 প্রাণ খুলে হাসে ইমরান, ‘আর&টি এর মালিক, মানে- আসল রেজার সাথে গবেটটার দেখা না হলেই হয় ।’

হাসিতে যোগ দেয় তৃণা আর রাশেদও । রাশেদের সাথে হাত মেলায় তৃণা । এখানে ওর কাজ শেষ ।

‘থ্যাংকস এ লট রাশেদ ভাই । থ্যাংকস এ লট ।’

 

তৃণাকে আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে রিয়াদ যখন স্নিগ্ধার হাত ধরে দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে গেছে – তৃণা ছয়টি মাস আচ্ছন্নের মত পার করে । সারাটিদিন ঘরের মধ্যে নিজেকে বন্দী করে ফেলে । তারপর থেকে তৃণার মাথায় প্রতিশোধের চিন্তা ছাড়া আর কিছু কাজ করে না । পার্থিব মর্যাদার দোহাই দিয়ে ওকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে যেই ছেলে – তাকে সে দেখিয়ে দেবে তার থেকেও বেশি মর্যাদার কাওকে পেতে পারে ও ।

 রিয়াদের ইউনিভার্সিটি লাইফের বন্ধু রাশেদ কোনদিনই রিয়াদের আচরণকে ন্যায় বলে মানতে পারে নি । কাজেই এ ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগীতা দেয় রাশেদ । খালাত ভাই ইমরানকে রেজার ভূমিকায় অভিনয় করার কথা বলতেই সানন্দে রাজি হয়ে যান ইমরান । বোনকে এবং পরিবারকে অসম্মান করে পার পেয়ে যাওয়া ছেলেটার বিরুদ্ধে কাজ করে পাওয়া আনন্দটাকে উপরি হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি ।

 

 চাঁদের দিকে তাকায় তৃণা ।

 আজকের চাঁদটা সুন্দর । আকাশেও মেঘ নেই ।

 বিড় বিড় করে বলে ও, ‘গুডবাই, রিয়াদ ।’

৩ । সিক্ততা

Standard

আন্টির বাসা থেকে বের হয়ে ছাতা ফুটিয়ে মাথায় দিতেই ফারিহা দেখল – ছেলেটা ভিজছে ।

বর্ষাকাল ।

যখন তখন ঝুম বৃষ্টি নেমে যায় । গবেট-শ্রেণির লোক দেখেও শেখে না – ঠেকেও শেখে না । ছাতা ছাড়াই বের হয় । এবং ভেজে ।

এই ছেলেটাকে তার গবেট শ্রেণির মনে হচ্ছে না ।

Image

রাস্তার পাশে ফারিহা একটু দাঁড়াল ।

ঢাকার রাস্তায় বৃষ্টির দিনে রিকশা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । রিকশাওয়ালারাও এই সুযোগে ভাড়া চারগুণের নিচে হাঁকে না ।

ফুটপাতের কিনারায় কাকভেজা ছেলেটার দিকে চোখ পড়তে বাধ্য । পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে মনে হচ্ছে স্বচ্ছল ঘরের সন্তান । হাতে একটি ফাইল । ইউনিভার্সিটির ছাত্র হবে হয়ত । চেহারা আকর্ষনীয় ।

হঠাৎ বৃষ্টিতে বিভ্রান্ত মানুষগুলোর মত এ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে না ।

মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

ফারিহার ইচ্ছে করল ওকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয় ! রাস্তায় একটা রিকশা নেই – আর এদিকে ন্যাকামো হচ্ছে !

 

এমনিতেই ওর মনটা বিক্ষিপ্ত । আন্টির সাথে দেখা করার পর মেজাজ আরও চড়ে আছে ।

খালুর মামাতো ভাইয়ের ছেলে আমেরিকা থেকে বহুদিন পর বাংলাদেশে ফিরে এসেছে । আপদটা এসে জুটেছে আন্টির বাসাতেই । আর আন্টিরই যেমন কান্ডজ্ঞান – মাথায় উনার ঘটকালি ঢুকেছে । ফারিহার গুণের সাতকাহন তিনি সেই ছেলের সামনেই গেয়ে গেলেন । অপমানে পুরোটা সময় ফারিহার কান ঝাঁ ঝাঁ করেছে । তার ওপর বেরিয়েই এতসব ন্যাকামি দেখে রাগে ও দাঁতে দাঁত পিষল ।

 

‘আপা, কই যাবেন?’ সম্বিত ফিরে পেল ও রিকশাওয়ালার ডাকে ।

রিকশাওয়ালার মুখ আনন্দে ঝলমল করছে । মেয়ে প্যাসেঞ্জার সাধারণতঃ বৃষ্টির দিন ভাড়া নিয়ে গ্যাঞ্জাম করে না ।

আড়চোখে ফারিহা দেখতে পেল – ছেলেটা হাঁটতে শুরু করেছে ।

রিকশাওয়ালাকে কোন জবাব না দিয়ে ফুটপাথ ধরল ও । ন্যাকাটার রহস্য ভেদ করতে হবে ।

 

তবে এ সিদ্ধান্ত জটিলতা বাড়াল বই কমালো না ।

ওভারব্রীজের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় সিঁড়িতে বসে থাকা বৃদ্ধা মহিলাটির হাতে নিজের মানিব্যাগটা ধরিয়ে দেয় ছেলেটা ।

বিকারগ্রস্থের মত হেঁটে চলে সামনে ।

হাতে ধরা ফাইলটি ছুঁড়ে ফেলে দেয় রাস্তার পাশের ড্রেইনে ।

 

আবারও রাগে দাঁত কিড়মিড় করে ফারিহা । ঢাকার সুয়্যারেজ লাইনের এমনিতেই যে অবস্থা !

এর মাঝে আবার ফাইল ফেলা হচ্ছে । টাকা আছে – মানিব্যাগ দান করে দিচ্ছ বলে শহর তোমার বাবার ?

আর সহ্য হল না ওর । লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে ছেলেটাকে ধরে ফেলে ফারিহা ।

 

‘এক্সকিউজ মি?’

অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়ায় ছেলেটা, ‘আমাকে বলছেন?’

‘না! আমি বৃষ্টিকণার সাথে কথা বলছি !’ ঝাঁঝের সাথে বলে ফারিহা, ‘ড্রেইনের মধ্যে ফাইলটি ছুঁড়ে ফেললেন – মানে ?’

ছেলেটার চোখ জ্বলে ওঠে, ‘যতদূর মনে পড়ে – আপনার কিছু ছুঁড়ে ফেলিনি ।’

‘শহরটা আপনার বাবার সম্পত্তি? ড্রেইনে আজেবাজে জিনিস ছুঁড়ে ফেলবেন – আবার যুক্তি দেখাচ্ছেন?’

‘আমার ইচ্ছা । তোমার ভালো না লাগলে তুমি মুড়ি খাও ।’ আবার সামনে হাঁটে ছেলেটা ।

 

ফারিহা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে । এরকম ভাষায় প্রথম সাক্ষাতেই কোন ছেলে তাকে এভাবে বলবে এ তার কল্পনাতেও ছিল না ।

*

প্রায় এক মাস পরের কথা ।

লাইনে দাঁড়িয়ে ফারিহা । ফার্মগেট যেতে নিউ ভিশন ধরতে চায় ও । পার্টটাইম জবের ব্যাপার আছে ।

লোকাল একটা ম্যাগাজিনের প্রুফ রিডিং করার কাজটা পড়ে আছে । ভার্সিটির সিনিয়র ভাই তূর্য চেয়েছিল কাজটা ওকে দিতে । তূর্য ভাইয়ের সাথে দেখা করতেই যাচ্ছে এখন ।

পর পর দুটো বাস চলে যাওয়ার পর মোটামুটি লাইনের সামনে চলে আসতে পারে ও ।

পরের বাসে উঠে প্রথম যে সীটটি ফাঁকা পায় বসে পরে ।

 

বাস আসাদগেট পৌঁছতেই ওর মনে হয় পাশের সারিতে বসা ছেলেটা ওকে দেখছে ।

ফারিহার চেহারা যথেষ্ট সুন্দর – এবং সে বিষয়ে ও নিজেও ওয়াকিবহাল, তবে না তাকিয়েও ছেলেটির দৃষ্টিতে কৌতুহল অনুভব করে ও ।

এক ঝলক দেখেই ও চিনতে পারে – বৃষ্টিতে ভেজা রহস্যময় ছেলেটিকে ।

 

হঠাৎ মেজাজ টং হয়ে যায় ওর আবারও ।

‘সেদিন বাজে কথা বলার সময় খেয়াল ছিল না ! এখন তাকাও কেন বেয়াদব ছেলে।’ মনে মনে ভাবে ফারিহা।

দ্বিতীয় সাক্ষাতের কোন ইচ্ছেই ওর মধ্যে নেই । বাস থেকে লাফিয়ে নেমে সামনে হাঁটে ও ।

এবং যা ভাবছিল – পেছন থেকে শুনতে পায়, ‘এক্সকিউজ মি’

ঘুরে যতটা সম্ভব সেদিনের উচ্চারণ নকল করে ফারিহা, ‘আমাকে বলছেন?’

‘দেখুন, গতবারের ব্যাবহারের জন্য আমি খুবই লজ্জিত । বিশেষ একটা কারণে সেদিন আমার মন এবং মেজাজ – কোনটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল না ।’

 

ছেলে লাইনে এসেছে – নিজে থেকে ক্ষমা চাইছে – তার ওপর মায়াকাড়া একটা চেহারা – ঝগড়াঝাটির এখানেই ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ফারিহা ।

‘সত্যি বলতে কি – সেদিন আমারও মন ভালো ছিল না । স্বীকার করতেই হচ্ছে – বাড়াবাড়ি আমিও কিছুটা করে ফেলেছি …’

‘আমি তন্ময় ।’ হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলেটা ।

‘ফারিহা ।’ হাত মেলায় ফারিহা ।

*

এক মাস কেটে গেছে আরও ।

তন্ময় আর ফারিহার নাম না জানা দশা পালটে গেছে গভীর বন্ধুত্বে ।

ফার্মগেটেই নম্বর আদান-প্রদান করেছিল ওরা । আসলে ফারিহারই উৎসাহ বেশি ছিল ।

তন্ময়ের সেদিনের ব্যাবহারের তাৎপর্য জানার জন্যই কি না – তা সে নিজেও জানে না ।

 

ধীরে ধীরে তন্ময়কে আরও ভালো করে চেনে ফারিহা – যে তন্ময়ের সাথে প্রথমদিনের সেই তন্ময়ের কোন মিলই নেই ।

‘১৫ই মার্চ – আমি ভুলিনি’ মনে মনে ভাবে ফারিহা । ‘কয়দিন লুকাবা তুমি । ঠিকই জেনে নিব, হুহ’

অবাক করা ব্যাপার হল – ওর কাছে জানতে চায় নি – এমনটা নয় । কিন্তু প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে তন্ময় ।

এই যেমন আজ – জিয়া উদ্যানে হেঁটে বেড়াচ্ছে ওরা । কোন দিন কাজের অতিরিক্ত চাপ পড়লে একসাথে কোথাও ঘুরতে বের হয় মাঝে মাঝে । ফারিহার জীবনে বন্ধুদের সংখ্যা খুবই কম ছিল । তার মাঝেও তন্ময়ের মত খোলা মনের কেউ নেই । তন্ময়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমন – ফারিহার সাথে শেয়ার করে স্বস্তি পায় ও। দুইজনই একে অপরের মোবাইল নম্বর সেইভ করে রেখেছে BFF [বেস্ট ফ্রেন্ডস ফরেভার] নামে ।

 

হঠাৎ ফারিহাই তোলে প্রসঙ্গটা । আবারও ।

‘তুই – আজ পর্যন্ত একটাবারও আমাকে বললি না – আমাদের প্রথম পরিচয়ের দিন তোর কি হয়েছিল । ’

‘তোকে আমি আগেও কয়েকবার বলেছি – আমাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করবি না । আমি উত্তর দিতে পারব না । ’

‘ওকে !’ হাসে ফারিহা, ‘লেট মি গেস – তুই ছ্যাঁকা খেয়েছিলি ।’

‘একরকম ।’ অন্যদিকে তাকায় তন্ময় ।

‘মেয়েটা নিশ্চয় অনেক বোকা । নাহলে তোর মত ছেলেকে ছেড়ে যাবে কেন ?’

‘আমাকে খুঁচিয়ে তথ্য বের করতে চাইছিস তো ?’ চোখ পাকালো তন্ময়, ‘ফাইজলামি বন্ধ ! চল বাসায় ব্যাক করি । আমার ভালো লাগছে না ।’

 

মাঝে মাঝে ভাবে ফারিহা বোকাটার কথা । মানুষ মনে হয় আর প্রেম করে ছ্যাঁকা খায় না ?

এত রাখাঢাকির কি আছে ?

তবে একটা কথা ঠিক । তন্ময়ের কোনকিছুতেই পরাজয় পছন্দ না ।

ছেলেটা খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে । প্রথম প্রথম কিভাবে ‘উন্মাদ’ নামক ম্যাগাজিনটি ওর কার্টুনকে রিফিউজ করে দিয়েছিল আর তা ওর জন্য কত বড় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছিল সেই গল্প ফারিহার জানা ।

হয়ত এ কারণেই ওর পরাজয়ের কথা ও লুকিয়ে রাখতে চায় নিজের কাছেই ।

ফারিহাকে বললে কি হত ? সবই বলে ওকে তন্ময় ।

‘গাধা একটা’ – ভাবে ও ।

 

তার ওপর একদিন তূর্য ওর কাছে জানতে চায়, ‘কিরে, তন্ময়ের সাথে জুটলি কিভাবে?’

অবাক হয় ফারিহা, ‘আপনি ওকে চেনেন কিভাবে? লং স্টোরি ভাইয়া ।’

তূর্য অবাক হয়, ‘চিনব না ! আমার কলেজের ছাত্র ছিল । আমার এলাকায় থাকে । আমার ক্লোজ ছোটভাই । আমাদের ম্যাগাজিনে ও আর্ট নিয়ে মাঝে মাঝে সাহায্যও করে ।’

প্রশ্নটা করা ঠিক হবে কি হবে না – না বুঝেই করে ফেলে ও, ‘ভাইয়া ওকে কিছু একটা নিয়ে ডিস্টার্বড দেখি । ওর কি ইদানিং এর ভেতর ব্রেক আপ হয়েছে কারো সাথে? ’

ঘরের ছাদ কাঁপিয়ে হাসে তূর্য, ‘তন্ময় করবে প্রেম ? ব্রেক আপ তো পরের কথা । আমার জানামতে ওর কোন বান্ধবীও ছিল না । তাই তো তোর কথা ওর মুখে শুনে অবাক হলাম । আরে শিল্পী মানুষের মাঝে মাঝে উদাস হতে হয় । ও নিয়ে ভাবিস না ।’

 

লজ্জা পেয়ে সরে আসে ফারিহা । তূর্য ভাই নিশ্চয় ভেবেছে তন্ময়ের প্রেমে ও হাবুডুবু ! আর ও-ও একটা যাচ্ছেতাই ! এভাবে কেউ জানতে চায় ? কিন্তু – নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায় ফারিহা । তন্ময়কে কি ও বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু করে পেতে চায় না ?

 

তবে নিজেকে চোখ রাঙ্গায় ফারিহা । কেন ও এত করে ভাববে তন্ময়ের কথা ।

ওরা শুধুই বন্ধু । এভাবে ভাবাটা অন্যায় । কিন্তু ভাবাভাবির ব্যাপারটা কি আর ওর হাতে তখন আছে ?

 

পরের কয়েকটা দিন যতবার তন্ময়ের সাথে দেখা হয় ফারিহার – প্রতিবারই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় ওর । তন্ময়টাকে ছাড়তেই ইচ্ছে করে না । কোন কারণ ছাড়াই ওকে ফোন দিয়ে ডাক দেয় ও, ‘হ্যালো তন্ময় – মন ভালো না । চল কোথাও ঘুরে আসি ।’

 

আসলে ছাই – তন্ময়কে দেখার ছুতো । আর পাগলটাও যা – ইদানিং সারাদিনই ছবি আঁকে । যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ ছবি নিয়েই বকবক করে । ওর আবার ইদানিং বিশ্বকে চমকে দেওয়া একটা ছবি আঁকার ইচ্ছে হয়েছে । ফারিহার কি আর অতসব মাথায় ঢোকে ? ও শুধু তন্ময়কে দেখে । ছেলেটার চোখ দুইটা এত্ত পরিষ্কার – ফারিহার ইচ্ছে করে ওখানে ডুবে মরতে । আর ও হাসলে তো ফারিহার মাথা হ্যাং করে যায় – এত সুন্দর করে একটা মানুষ হাসে কি করে ?

প্রায় প্রতিদিনই দেখা করলেও ফারিহার সাহস হয় না ওর অনুভূতির কথা বলার ।

 

না – তন্ময় ‘না’ করে দেবে সেই ভয়ে যতটা – তার থেকেও বড় ভয় তন্ময়ের প্রথম দিনের ব্যাখ্যার ।

ও যে পাগল – হয়ত সেই মেয়েকে জেতার একটা জেদ নিয়ে বসে আছে আজও ।

মাঝখান থেকে ফ্রেন্ডশীপে একটা দূরত্ব আসবে ।

প্রতিদিন তন্ময়কে কিভাবে দেখবে ও তখন ?

*

আরেকটি মাস প্রায় গড়িয়ে যায় এভাবে । এর মাঝে একদিন বহুদিন পর তন্ময়ের মুখে হাসি দেখে ফারিহা ।

‘তোকে বলেছিলাম আমার একটা – মাত্র একটা ছবি আঁকার সখ ছিল । পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার জন্য ।’

‘তুই একটা পাগল । সব কিছুতেই তোর তাড়াহুড়ো ।’ ওকে আলতো ঘুষি মারে ফারিহা ।

‘ছবিটার কাজ শেষ,ফারিহা । আজ আমরা সেলিব্রেট করব ।’ ঘুষি ফেরত দেয় তন্ময় ।

‘কি খারাপ ! কি খারাপ !! আমাকে দেখাবি না ?’ অনুযোগ করে ফারিহা ।

‘অফকোর্স ! আর মাত্র কয়েকটা দিন দোস্ত ।’

 

কিন্তু কয়েকটা দিনের কথা বললেও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ছবিটা দেখা হল না ফারিহার ।

বলা যায় – একটা সপ্তাহ তন্ময়ের সাথে ভালোমত যোগাযোগও হল না ফারিহার ।

মনে মনে গালি দিয়ে ওর ভূত ভাগায় ফারিহা – পাগলটার হয়ত ছবির কাজ বাকি ছিল – এখন আমাকে দেখাতে হবে তাই ডুব মেরে কাজ শেষ করছে – নিজেকে বোঝায় ও ।

 

মোবাইলের রিংটোন বাজতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ও – কিন্তু তন্ময় না – তূর্য ভাইয়ার কল । বিরক্ত হয়েই ফোন রিসিভ করে ফারিহা ।

‘তোকে কিভাবে ব্যাপারটা বলব বুঝতে পারছি না ।’

‘ভাইয়া কি তন্ময়ের শেষ ছবিটার কথা বলছেন ? অবাক হয়েছেন তো ? আমি জানতাম ও এবার অসাধারণ কিছু একটার জন্ম দেবে । আমি অবশ্য এখনও দেখি নি -’

‘তন্ময় মারা গেছে ফারিহা । গত পরশু রাতে ।’ কন্ঠ সিক্ত হয়ে আসে তূর্যের । ‘তার আগে আমাকে মেসেজ দিয়েছিল যেন তোকে বলি তোর মেইল চেক করতে । আমি ভেবেছিলাম তোদের ঝগড়া – তাই । তখন যদি বুঝতাম রে …’

আরও কি কি বলে যায় অপরাধী কন্ঠ নিয়ে তূর্য ভাই – কানে কিচ্ছু শুনতে পায় না ফারিহা । হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায় আলতো করে ।

একটা যন্ত্রের মতই কম্পিউটারের সামনে বসে পড়ে ও ।

ফেসবুক এবং মোবাইল চেক করলেও ই-মেইলটা রোজ চেক করা হয় না ।

একটি অ্যাটাচমেন্ট সহ একটী মাত্র আনরীড মেইল ।

 

প্রথমে ওর চোখ পড়ে ছবিটির ওপর ।

ফারিহার একটা পোট্রেট । সম্পূর্ণ ডিটেইলস তন্ময় নিজের মাথা থেকে এঁকেছে । ফারিহার মুখে একটা অপার্থিব হাসি – যে হাসিতে একই সাথে ভালোবাসা – কান্না – সুখ এবং দুঃখের প্রতিচ্ছবি । একটি সাধারণ ছবি কিভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠে চোখের সামনে তা ফারিহা বুঝতে পারল না – তখন ওর চোখ বার বার ঝাপসা হয়ে আসছে ।

মেইলটা ওপেন করল ও ঝাপসা চোখেই ।

 

‘ফারিহা,

তুই অনেক ভালো একটা মেয়ে । এবং অসাধারণ । পৃথিবীতে যদি এখনও একটা নিখুঁত মেয়ে থাকে – তবে নিঃসন্দেহে সেটা তুই ।

আমি চিঠি লেখতে পারি না – লেখিনি কখনও । কিন্তু তোর কিছু কথা জানার অধিকার আছে – যে কথাগুলো আমি সামনে দাঁড়িয়ে তোকে কখনোই বলতে পারব না ।

তুই সবসময় বলতি আমি বোকা । তোর কথা এতটা সত্য আমি নিজেও জানতাম না । তোর বন্ধুত্বের আড়ালে নিজেকে অনেক সুখী মনে হত – জীবনকে অনেক শান্ত । কখন যে বোকার মত তোর প্রেমে পড়ে গেলাম !

তুই আমাকে ভালোবাসতি সেটা আমি জানি – তুই আমাকে ফিরিয়ে দিতি না – সেটাও আমি জানি ।

এখন হয়ত ভাবছিস – কেন তোকে বলিনি? আর কেনই বা তোকে আমার জীবনের সবকিছু শেয়ার করেছি শুধু আমাদের প্রথম দেখার দিনটি বাদ দিয়ে ?

তারিখটি তোর মনে আছে কি না জানি না । তবে আমার আছে ।

১৫ই মার্চ । যেদিন আমি হাতে পেলাম আমার ক্যাট স্ক্যানের রিপোর্ট ।

মাথা আরও কয়েক মাস ধরেই হঠাৎ হঠাৎ প্রচন্ড রকম ব্যাথা করত । পাত্তা দেইনি । অনেক সময় নিয়ে ছবি আঁকতাম বলে ভাবতাম – চোখের ওপর বেশি প্রেশার দেওয়ার ফল । অবশেষে ডাক্তার দেখালাম । স্ক্যান করতে বলল আমাকে । স্ক্যান রিপোর্ট নিয়ে কন্সাল্টেশন সেন্টার থেকে মাত্র দুঃসংবাদটা নিয়ে বের হয়েছি – বড়জোর দুই থেকে আড়াই মাস বাঁচব আমি – ঠিক তখনই দেখিস তুই আমাকে ।

টিউমারটা এতটাই গ্রো করেছিল আমার দশমিকের কোঠায়ও সুযোগ ছিল না ।

 

আমাকে মাফ করে দিস ফারিহা । তোকে পেয়ে হারানোর বেদনা দিতে চাইনি ।

আর – বেশি কাঁদিস না ।

কথা দিচ্ছি – এই জন্মে হতে না পারলেও ওই জন্মে ঠিকই তোর হব ।

 

– ফারিহার তন্ময়’

*

ফারিহার ফোনে রেসপন্স না পেয়ে তূর্য ওর বাসার সামনে গাড়ি থেকে নেমে দেখল –

 

মেয়েটা ভিজছে

২ । অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ

Standard

অ্যারেঞ্জড ম্যারেজল্যাবে ঢুকেই থমকে গেল তুষার । ওর গ্রুপমেটদের সাথে ওই নতুন মেয়েটা কে ?

কাছে যেতেই হাত বাড়িয়ে দিল নতুন মেয়েটা । ‘হাই, আমি তৃণা । তুমি নিশ্চয় তুষার । তোমার কথা গ্রুপমেটদের কাছে শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গেছে একেবারে !’

যান্ত্রিক ভাবে করমর্দন করল তুষার । জানতে পারল অন্য একটা ভার্সিটিতে ছিল তৃণা । মাইগ্রেট করে ওদের ভার্সিটিতে জয়েন করেছে । পুরো ব্যাপারটাই তুষারের পছন্দ হচ্ছে না ।

কেন পছন্দ হচ্ছে না – সেটা বুঝতে ল্যাবে মাত্র আধ ঘন্টা কাটানোটাই যথেষ্ট ছিল ।

 

যেকোন বিষয়ে তৃণার সিদ্ধান্ত একবাক্যে মেনে নিচ্ছে প্রত্যেকটা গ্রুপমেট । তানভীর তো বাতাসের আগে আগে ছুটে যাচ্ছে যা কিছু দরকার আনতে । দু-একটা সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে তুষার আপত্তি করে গেলেও লাভ কিছু হল না । মনে হচ্ছে ও অদৃশ্য । অথচ তৃণার সামান্য ইঙ্গিতেই লাফালাফি করে হুকুম তামিল করে যাচ্ছে বিশ্বাসঘাতকগুলো ।

গ্রুপের সবার মনযোগ মেয়েটার দিকে । সজীবটা আবার বেহায়ার মত হেসেও যাচ্ছে ।

 

মাত্র দুই সপ্তাহ ভার্সিটির বাইরে ছিল ও । ফুটবল খেলতে গিয়ে পা ভালভাবেই মচকেছিল । তাতেই আধিপত্য বলতে আর কিছু থাকছে না মনে হয় । রাগে দাঁত কিড়মিড় করল তুষার । এতদিন এই গ্রুপটার মধ্যে ওরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য । তাছাড়া সবাইকে কাজ করার সুযোগ করে দিত ও – যাতে সবাই-ই শিখতে পারে । জটিল কোন সমস্যায় আটকে গেলে তুষারই ছিল সবার উদ্ধারকারী ।

কথায় কাজ হবে না বুঝে চুপচাপ ল্যাবের সময়টা পার করে দিল তুষার ।

*

‘মামা, একটা বেনসন দেন।’

শরীফ মামার চায়ের দোকানে এসেই সিগারেট ধরালো তুষার । তৃণা চোখের সামনে থেকে দূর হওয়ার পর থেকেই তানভীর সজীব আর রাশেদ আগের মতই ব্যবহার করছে তুষারের সাথে ।

তুষারের মন-মেজাজ ভালো নেই বুঝতে পেরে কয়েকটি অশ্লীল জোকস ছাড়ল সজীব ।

 

‘শালা – তোমাদের সুন্দরী মাইয়া দেখলেই আর মাথার ঠিক থাকে না !’ খেঁকিয়ে উঠল তুষার । ‘দুইটা সপ্তাহ পায়ে ব্যাথা নিয়া পইড়া ছিলাম সে কথা একটা বার ভাবস নাই – সেটা মানলাম । কিন্তু এখন দেখি আমাকে চিনতেও পারিস না আর !’

‘দোস্ত – এটা তোর বোঝার ভুল ।’ ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল রাশেদ, ‘আমরা প্রতিদিনই তোকে দেখতে গেছি প্রথম সপ্তাহ । তারপর তোর অবস্থার উন্নতি হয়েছিল ভালই । তাছাড়া ভার্সিটিতে চাপ বেড়ে যাওয়ায় …’

‘চাপ বেড়ে যাওয়ায় !’ সিগারেটে জোরসে টান দিয়ে বলল তুষার । ‘নাকি বল তারপরই তৃণা শালি চলে আসায় আর আমাকে তোদের মনে নাই ?’

‘তোর হবে রে ।’ এতক্ষণে কিছু একটা বলল তানভীর ।

‘কি হবে?’

‘প্রেম ।’

‘মেজাজ ভালো নাই,শালা ।’ উঠেই গেল তুষার, ‘আজাইরা কথা বলবি তো বল । আমি গেলাম ।’

বন্ধুদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে বেড়িয়ে গেল তুষার ।

*

ক্লাসে অথবা ল্যাবে – তৃণা হয়ে গেল তুষারের দুই চোখের বিষ ।

যেখানে যেভাবে পারে – ওকে এড়িয়ে চলে অথবা খোঁচা দিয়ে কমেন্ট করে তুষার ।

তৃণা আবার এদিক থেকে এক ডিগ্রী উপরে । তুষারকে দিগন্তরেখায় দেখলেই চিল চিৎকার, ‘তুউউউউউউউউষার ! অ্যাই !! এইদিকে !!…’

ফর্মালিটি রক্ষার্থে দুই-একটা কথা বলতেই হয় ।

পার হয়ে গেল এভাবেই চারটা মাস ।

 

শরীফ মামার দোকানে একদিন ক্ষোভে ফেটে পড়ল তুষার ।

‘নিজে এক ভার্সিটি থেকে ভেগে গেছে শালি এখন আমাকে তাড়াতে চায় !’

‘তৃণার কি দোষ ?’ দোষী পক্ষের উকিল দাঁড়িয়ে গেল তানভীর ।

‘খুব ভালো করে জানে ওকে সহ্য করতে পারিনা । ইচ্ছে করে সামনে আসে – গায়ে পড়ে কথা বলতে চায় ! আইডিয়া কি ওর না তোরা আমার পিছনে লাগিয়ে মজা নিচ্ছিস ?’

‘তুই একটু বেশিই ভাবছিস । আমার মনে হয় মেয়েটা তোকে পছন্দ করে ।’ স্বভাবসুলভ অল্প কথায় কাজ সাড়ল রাশেদ ।

‘তোর মাথা আর মুন্ডু । আমার ডিস্টার্বড মুখ দেখে বেয়াদবটা মজা পায় – আর কিছু না ।’ মেনে নিতে রাজি নয় তুষার ।

*

‘বেয়াদব’টা যে শুধু তুষারের বিরক্ত মুখ দেখে মজা পায় – এই ধারণা পরের সপ্তাহেই ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল ।

রাতের বেলায় ফেসবুকে তৃণার মেসেজ পড়ে গরম চায়ে ঠোঁট পুড়িয়ে ফেলল তুষার ।

 

‘এত ইগনোর কর কেন ? চোখ দেখনি আমার একবারও ? বোঝনা এতটা রুড বিহেভের পরও কেনই বা তোমার সামনে পড়ি ? আমার ভবিষ্যত তোমার হাতে বাঁধা । সিদ্ধান্ত তোমার । জানিও আমায় । তোমাকে ছাড়া জীবনটা পার করার কথা ভাবতেও পারি না ।’

 

সকাল সকাল রাশেদ – তানভীর – সজীবের ডাক পড়ল শরীফ মামার দোকানে ।

ঘটনা শুনে উৎফুল্ল সবাই ।

‘মাম্মা !! তোমার তো হইয়াই গেল ।’ পিঠ চাপড়ে দেয় সজীব উচ্ছ্বাসে ।

‘শরীফ মামা, বিল তুষারের । বেনসন দেন চারটা ।’ রাশেদ বলে ।

‘বলবি কি ওকে ?’ কনক্লুশন চায় তানভীর, ‘মেয়েটা কিন্তু জোস ! রাজি হইয়া যা বলদ।’

‘এমন ভাব কেন নিচ্ছিস যে আমার জীবনের গল্প তোরা জানিস না ?’

বিষাদের ছায়া নেমে আসে চারজনের ছোট্ট সার্কেলটিতে ।

*

তুষারের বাবা এক বছর আগে মারা গেছেন । মৃত্যুশয্যায় তাঁর একটাই কথা – বন্ধুকে দেওয়া কথার যেন খেলাপ না হয় । তাঁকে যেন ওয়াদা খেলাপকারী বানানো না হয় । তুষার নিজে বাবার হাতে হাত রেখে বলেছে – সেদিকটা ও নিশ্চিত করবে । তখনও ও জানত না ঠিক কি বিষয়ে কথা বলছে বাবা ।

আগে কখনও ওর সামনে এর আলোচনা হয় নি । বাবার মৃত্যুর পর মা জানায় ওকে পুরো কাহিনী ।

তুষারের ছেলেবেলা কাটে চট্টগ্রামে । বাবার কর্মস্থল সেখানেই ছিল তের বছর । তুষারের জন্মও ওখানে । সাত বছর পর্যন্ত ওখানে ছিল ও । বাবার ছেলেবেলার বন্ধু কাম কলিগ আরিফুজ্জামানও ছিলেন ওখানে । দুটো পরিবার মিশে গেছিল ওতোপ্রোতভাবে । তুষারের ছয় মাসের ছোট একটা মেয়ে ছিল তাঁদের । অনেক বাঙ্গালী বন্ধুদের মতই ঠিক করেন নিজেদের ছেলে-মেয়েদের সাথে বিয়ে দিয়ে সম্পর্ক চিরস্থায়ী করে ফেলতে ।

পরবর্তী এতগুলো বছরের মাঝে কেউই ভুলে যাননি সে কথা । তুষারের বাবা সিগারেট খেতেন প্রচুর । লাংসে যখন ক্যান্সার ধরা পড়ল তখন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে গোটা ফ্যামিলির । বাবাকে নিয়ে ছোটাছুটি করে নি এমন কোন জায়গা নেই । কিছুতেই কিছু হল না । অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যেতেই থাকল । মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে ছেলেকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে যান তিনি ।

‘বাবার দেওয়া কথা আমার কাছে আমার জীবন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ । রাজি হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না ।’ শেষ কথা তুষারের ।

*

রেস্টুরেন্টের নিরিবিলি কোণায় বসে তুষার আর তৃণা । এই জায়গায় ওকে একরকম ধরেই এনেছে তৃণা ।

আড়চোখে মেয়েটাকে দেখল তুষার । লজ্জা পাচ্ছে মনে হয় । মাথা নিচু করে বসে আছে একটা উত্তরের আশায় । নারীর লজ্জার সাথে সৌন্দর্য্যের একটা যোগসূত্র আছে মনে হয় । গালের লালচে আভা আর নিচের ঠোঁট আলতো করে কামড়ে ধরায় তৃণাকে আরও সুন্দরী লাগছে । চুলের রেখা গুলো চোখের গরাদ দিয়েছে । বুকের ভেতর খালি খালি লাগল তুষারের । এত সুন্দর একটা মেয়েকে কষ্ট দিতে হবে ভেবে । কান্নাকাটি না লাগালেই হয় । সুন্দরী একটা মেয়ের কান্না দেখার চেয়ে দূরবর্তী কিছুই নেই তুষারের কাছে।

ধীরে ধীরে ওকে খুলে বলল তুষার । ওর জীবনের গল্প । ছেলেবেলার অদ্ভুত সেই সিদ্ধান্তের কথা ।

শুনতে শুনতে পানি জমে ওঠে তৃণার চোখের কোণে ।

ভূতের মত বেরিয়ে পড়ে দুইজনে ।

আজ কি যেন হয় তুষারের । তৃণাকে বাসায় পৌঁছে দেয় ও ।

নিজের বাসায় ফিরে আসার সময় অদ্ভুত একটা খারাপ-লাগা অনুভূতি কাজ করে ওর ভেতর ।

বাবার কথা ভেবে মাথা থেকে বের করে দেয় সবকিছু ।

*

তিনটি দিন পার হয়ে গেছে ।

ভার্সিটি যেতে আর ইচ্ছে করে না তুষারের ।

বন্ধুদের ফোন অগ্রাহ্য করে । আর ছয়টা মাস পরই ভার্সিটি-জীবন শেষ ওর । এর পরই মা বিয়ের কথা টানবেন ।

আজকাল ঘুরে ফিরে শুধু তৃণার মুখটাই ভেসে ওঠে তুষারের মনে । আসলেই কি ও মেয়েটাকে দেখতে পারত না ?

একটা কথা ঠিক – তিক্ত একটা অনুভূতি প্রথম প্রথম ওর ভেতর কাজ করছিল যখন ওকে প্রথম দেখে । কারণ ওর মনে হয়েছিল বন্ধুদের থেকে দূরত্বের জন্য তৃণাই দায়ী । যদিও মেয়েটার দোষ আসলে ছিল না । অথচ – এর ওপর ভিত্তি করেই অসংখ্যবার ওকে অপমান করে তৃতীয় কাওকে কিছু বলেছে তৃণার সম্পর্কে, তৃণার সামনেই । মেয়েটার হাসিখুশি মুখ অনুজ্জ্বল হয়ে যেতে দেখে ভেতরে ভেতরে তৃপ্তি পেয়েছে ।

আজ প্রথম যেন উপলব্ধি করল – তৃণাকে ও ঘৃণা করত না – মেয়েটাকে ওর ভালই লাগত । শুধুই ভালো লাগত ? গত তিনদিনের প্রতিটি সেকেন্ড কেন তাহলে তৃণা ওর মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে । বুঝল তুষার – আর লুকিয়ে লাভ নেই – এই কয় মাসে তৃণার প্রতি কখন ওর তীব্র একটা ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে – ও জানে না ।

জানতেও চায় না ও । আজ মনে হচ্ছে – শুধুই একটা ছেলেমানুষী সিদ্ধান্তের জন্য ওর জীবন পালটে ফেলার কোন ভালো কারণ নেই । কেন ওকে বিয়ে করতে হবে সেই মেয়েকে – যার কথা ওর মনেই নেই ঠিকমত ?

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তুষার । তৃণার মোবাইল নাম্বার ওর কাছে নেই । শুধু ফেসবুক আইডির মাধ্যমে যোগাযোগ হত ।

 

এখন ভার্সিটিতে ওদের থাকার কথা । পোশাক পরে বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় তুষার ।

ঠিক এই সময় মা ঘরে ঢোকে ।

‘আরিফুজ্জামান ভাই তার মেয়েকে নিয়ে এসেছেন । বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চান উনারা ।’

‘খ্যাতা পুড়ি!’ মনে মনে বলে তুষার ।

মুখের অবস্থা দেখেই মনের কথা পড়ে ফেলেন মা, ‘ছেলেমানুষী সিদ্ধান্ত নিয়ে উনি সচেতন । তোদের মতামত জানতে চান কেবল । মুখদর্শনের ব্যাপার শুধু – বাবা । এরকম মুখ কালো করিস নে ।’

*

ছেলে-মেয়েকে নিজেদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ দিয়ে হাওয়া হয়ে গেলেন অভিভাবকদ্বয় ।

‘তৃণা !’ আনন্দের সাথেই অবাক হয় তুষার । ‘তুমি আমাকে আগে বলনি কেন??’

‘আজ তোমাকে অন্য কিছু বলতে এসেছি তুষার ।’ বিষন্ন গলায় বলে তৃণা, ‘তুমি এখন আমাকে জীবনসঙ্গী করতে রাজি, তাই না?’

‘সানন্দে ! তৃণা তুমি জানো না একয়দিন আমার -’

তুষারকে বাক্য শেষ করতে দেয় না তৃণা । ‘আমার জন্য কোন অনুভূতি নেই তোমার তুষার। তোমাকে আমি কিভাবে বিয়ে করি বল ? তুমি কেবলই রাজি হচ্ছ তোমার বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণের লক্ষ্যে । এমনটা হবে আমি জানতাম । সেজন্যই আমার ভার্সিটি মাইগ্রেট করে তোমার কাছে আসি আমি । ছেলেবেলা থেকেই তোমাকে হাজব্যান্ডের জায়গা দিয়ে এসেছি । আমি জানতাম বাবা-মার ইচ্ছের কথা । সেখান থেকে কখন যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলি ! কিন্তু জানি তোমার মধ্যে কখনও আমার প্রতি কিছুই ছিল না । তোমার ভার্সিটিতে তোমার কাছে এসে চেয়েছিলাম নিজের স্থানটা করে নিতে । কিন্তু হল কই ?’ চোখ মোছে তৃণা । ‘শেষ পর্যন্ত তুমি সেই প্রতিজ্ঞাকেই বিয়ে করতে যাচ্ছ । আমাকে না ।’

‘তুমি সব না শুনে এসব ধারণা করতে পার না, তৃণা ’ তৃণার দিকে সরাসরি তাকায় তুষার, ‘গত তিনদিন আমি খুব ভালোভাবেই ভেবছি আমাদের ব্যাপারে । আমার মনে হয়েছে – বিয়ের ব্যাপারটা একটা প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে ঠিক করে ফেলার মত বড় ভুল আর কিছুই হতে পারে না। আমি আজই তোমার কাছে যেতাম । আমার সিদ্ধান্ত তোমাকে যেতে । তৃণার কাছে যেতাম । প্রতিজ্ঞার কাছে না ।’

‘মিথ্যে বলে আমাকে ভুলিও না, তুষার – প্লিজ।’ রীতিমত কাঁদছে তৃণা ।

‘সত্য-মিথ্যা যাচাই-এর আগে – একটি বার কি তোমার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে, তৃণা ?’

 

মোবাইল বের করে ফেসবুকে ঢোকে তৃণা । একটি নতুন মেসেজ ।

‘মাসের পর মাস নিজের সাথে লুকোচুরি খেলে আমি ক্লান্ত । আমার ভবিষ্যতও যে তোমার হাতে বাঁধা । সিদ্ধান্ত আমার – বলেছিলে তুমি । আমি তোমার হতে চাই । উইল ইউ ম্যারি মি ?’

 

তুষারের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অঝোরে কাঁদে তৃণা । তবে এ কান্না স্বস্তির – আনন্দের।

১ । গরু

Standard

‘গরু ম্যানেজ হয় নি -’ খবর পেতেই আর বিন্দু মাত্র দেরী না করে আনন্দস্পটে চলে আসলাম ।

যুবরাজ সিং-এর মত করে নাকটা আকাশের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে ছিল ফারহান ।

 

মনটা চাইল নাকের ওপর একটা বিরাশি ছক্কার ঘুষি বসিয়ে ফারহানটাকে চ্যাপ্টা করে ফেলতে । কিন্তু আজকের এই বিশেষ আনন্দের দিনটা নষ্ট করতে চাইলাম না ।

 

‘ফান্ডের টাকা দিয়ে Galaxy S4 কে কিনেছিল চাঁদ ?’ মনে মনেই হুংকার ছাড়লাম ।

 

তবে এখন আত্মকলহের সময় নয় ।

সামনে ঘোরতর সমস্যা । একেবারে ‘ইজ্জাত কি সাওয়াল’!

 

দেখলাম কসাইও প্রস্তুত । আট দশেক রকমের ছুড়ির মাথা ধারালো করছে কসাই মামা আর তার অ্যাসিস্ট্যান্টদ্বয় ।

আস্ত গরু জবাই করে প্রেমসে খাওয়া-দাওয়ার আমেজটাই নষ্ট হয়ে গেল দিনের শুরুতেই !

আজ আমাদের ক্লাবের বর্ষপূর্তি ।

 

জিনিসটা শুরু হয়েছিল ঠিক এক বছর আগে ।

*

রাজশাহী জুড়ে রাস্তার পাশে আড্ডা দিতে দিতে ক্লান্ত তখন আমরা সবাই ।

 

‘দেশ রসাতলে গেল !’ বিজ্ঞের মত বলে উঠেছিল কাফি ।

‘বলে যা … বলে যা … ’ টিটকিরির সুরে তাল মেলায় ফারহান । ‘সবার অভিযোগ দেশ রসাতলে গেল । কিন্তু এক পা আগানোর বেলায় সব অকর্মার ঢেঁকি ।’

‘ছেড়ে দে ।’ মধ্যস্থতায় আসতেই হল আমাকে, ‘ছেলেমানুষ । কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছে !’

‘ছেলেমানুষ!’ হুংকার দিয়ে উঠল কাফি, ‘এই বছরেই সবাই তো রীতিমত আঠারোয় পা দিয়েছিস ! তবুও ছেলেমানুষ ?’

‘তো কি হয়েছে?’ পাশ থেকে মিনমিন করে বলল রাইয়ান, ‘মেয়েমানুষ তো বলেনি ।’

‘তোদের জন্যই দেশের আজ এই দশা ।’ দেশমাতৃকার প্রেমে বিগলিত তখন কাফি, ‘আজ এই টগবগে তরুণদের রক্ত যদি শীতল না হত – বয়লারের মুরগি খেতে খেতে যদি এরা মুরগি না হত – তবেই বুঝত এরা – এই দেশের জন্য তাদেরও দায়িত্ব আছে বৈকি ! যুবসমাজ – এই মুহূর্ত থেকে দেশসেবায় নিয়োজিত হও । আহবান জানালাম উদারচিত্তে ।’

 

‘উদরপূর্তির পরে এ নিয়ে আলোচনা করলে আমাদের মাথা খুলবে ভালো ।’ একমত হয়ে গেলাম নিমেষেই । ‘ওই যে একটা চটপটির দোকান ।’

‘হ্যাঁ, ওইটা একটা চটপটির দোকান ।’ সায় জানাল কাফি । ‘সে তো আমিও দেখতে পাচ্ছি । কিন্তু খাওয়াচ্ছেটা কে, শুনি?’

‘নির্ঘাত তুই ।’ সমঝোতা করে দিল ফারহান, ‘উদারচিত্তে এবার চটপটির দোকানের দিকে হাঁটা দাও বাছা ।’

 

দোকান থেকে আধ ঘন্টা পর যখন আমরা চলে যাচ্ছি – কাফির পকেটের দীর্ঘশ্বাস এতদূরে থেকেও স্পষ্ট শুনতে পেলাম বলে মনে হল ।

ওর উদার মন রাতারাতি সংকীর্ণ হয়ে গিয়ে দেশসেবার ভূত বেড়িয়ে যাবে বলেই ভেবেছিলাম ।

*

কিন্তু না ।

 

দমে যাওয়ার ছেলেই সে নয় ।

রীতিমত একটা ঘর ভাড়া নিয়ে খুলে ফেলল ‘মিরবাগ সমাজসেবী যুবসংঘ’ । আর আমাদের সেখানে চাঁদা দিয়ে মেম্বার হতেই হল । ভেবেছিলেম পাড়ায় রীতিমত টিটকিরি পরে যাবে এই নিয়ে ।

 

কে বলেছে ‘মানুষ ভাবে এক – আর হয় আর এক?’

সেদিন স্বঘোষিত ইতিহাসবেত্তা জহির চাচাকে দেখে বেশ লম্বা একটা সালাম ঠুকে দিতেই একগাল হাসলেন তিনি ।

 

‘আরে ইমন যে !’ একপাশে পানের পিক ফেলে আবারও তরমুজের বিচির প্রদর্শনী মেলে দিলেন তিনি । ‘সমাজসেবা কেমন হচ্ছে?’

‘ভালই চলছে চাচা ।’ মুখ রক্ষার খাতিরে বলতেই হল । হচ্ছে তো ঘোড়ার ডিম । কাফি রোজ এক থেকে দেড় ডজন করে আইডিয়া বের করে কি করলে আজ জাতির মুক্তি হবে । কিন্তু কাজের বেলায় ঠনঠন । হবেই বা না কেন ? কর্মসূচীর বেশির ভাবই ‘অনন্ত জলীলের কাজ’ ;

 

যেমন – একটি কর্মসূচি হল পার্লামেন্টের সামনে আমরণ অনশনে নামা । যতদিন গার্মেন্টস শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ বেতন দেওয়ার অঙ্গীকার না করা হবে ততদিনের জন্য আহার-পানীয় নিষিদ্ধ । এদিকে বাহিনীতে আমরা পাঁচ জন । বলিহারী যেতেই হল ।

 

‘সে তো বুঝতেই পারছি বাছা ।’ আনন্দে মাথা দোলালেন জহির চাচা । ‘যতই দিন যাচ্ছে তোমার চেহারা চেঙ্গিস খানের মত হচ্ছে । চেন তো ? ইতিহাস বিখ্যাত সমাজসেবক । ইতিহাস পড়বে, বুঝেছ ? অনেক কিছু জানার আছে । শেখার আছে ।’

 

চেঙ্গিস খান আর সমাজসেবা !!

আমাদের ক্লাবের প্রতি সমাজের ধারণায় কোনদিক থেকেই উৎফুল্ল হতে পারলাম না ।

 

তবে কাফির একটা প্ল্যান অন্তত হিট !

‘সুসাস্হ্য এবং সুন্দর মনের জন্য চাই খেলাধুলো এবং ব্যায়াম ।’ একদিন এই অভিনব সমীকরণ আসে ওর মাথায় ।

 

ক্লাবে ক্যারাম বোর্ড – কার্ড জোন আর জিম সংযোজন করতেই হুড় হুড় করে পাড়ার ছেলেপিলের আগমন ঘটতে থাকল এবং তাদের পকেট থেকে চাঁদার টাকাও বের হতে থাকল বৈকি !

মেম্বারশিপ ছাড়া কাওকেই ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয় এবং মেম্বারশিপ মানেই মাসিক চাঁদার অব্যাহত ধারা – সুস্পষ্ট কথা কাফির ।

 

তরুণ সমাজের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল আমাদের ক্লাব । সমাজসেবা বলে কথা !

তবে সমাজে নিন্দুক থাকবেই ।

 

‘পাড়ার ছেলেপুলেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে’ আমাকে শুনিয়েই চায়ের দোকানে দোকানদারের সাথে আলাপ জুড়ে দিলেন জহির চাচা, ‘ তায় আবার নেপোলিয়ন আর চেঙ্গিস এক হয়েছে ! সারাদিন আমার পল্টুটা ক্লাবে গিয়ে পড়ে থাকে । দিন দিন ব্যায়াম করে করে গুন্ডা হচ্ছে !’

 

এরপর আর বসা চলে না । দাঁত কিড়মিড় করতে করতে উঠে পড়লাম ।

‘চেঙ্গিস আর নেপোলিয়ন ? গুন্ডা হচ্ছে ? নাহয় পাড়ার ছেলেগুলো এখন চিত্তাকর্ষতার ধাপে আছে – তাতেই নিন্দুক এতবড় অপবাদ রটালো ?’ চোখমুখ লাল করে বলল কাফি, ‘দ্বিতীয় ‘আনন্দমেলা’ ধাপের পরই তো আমরা সমাজসেবার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাব সে কি তারা বোঝে না !’

 

ফারহান একটা করে সবাইকে আইসক্রীম কিনে খাইয়ে পরিবেশ ঠান্ডা করল – অবশ্যই মেম্বারের চাঁদার টাকায় । সমাজসেবীদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হয় বৈকি !

 

*

বন্যার বেগে মেম্বারদের সংখ্যা বাড়তে থাকল । ততদিনে মেম্বারদের জন্য অন্য যেকোন জায়গা থেকে হাফ-চার্জে একটা সাইবার ক্যাফেও খোলা হয়েছে কি না ! পাড়ার সীমা লংঘন করে আশে পাশের এলাকার ছেলেছোকড়ারাও দিব্যি জুটে গেল মিরবাগ সমাজসেবী যুবসংঘে । আমাদের বিস্মিত করে দিয়ে আট মাসেই একশ ছাড়িয়ে গেল মেম্বারদের সংখ্যা !

 

ততদিনে এক বছরও হয়ে গেছে প্রায় ।

এক বছর পূর্তির জন্য একটা ছোটখাট ভোজের ব্যাবস্থা করা আমাদের নীতিগত দায়িত্ব মনে করলাম ।

রীতিমত হই-হুল্লোড় কারবার করতেই হবে ।

গরু থেকে মুরগি সবই স্পট ডেড বানিয়ে রান্না হবে । মানে ঘটনাস্থলেই জবেহ ।

সবই ঠিক ছিল ।

 

ফান্ডের টাকা কোথায় যায় !! – এই নিয়ে মেম্বারদের মনের চাপা অসন্তোষও ঘুঁচিয়ে দেওয়া যেত এই সুযোগে ।

ফান্ড উলটে পালটে দেখা গেল ভালোই আছে ।

 

ফারহান ছিল তখন ঢাকায় । প্ল্যান সামলে আমরা সবাই দুইদিনের ছুটি নিলাম । সামনে বড় প্ল্যান-প্রোগ্রামের ব্যাপার স্যাপার আছে । ব্যস্ততম (!) এক বছর শেষে অবশ্যই আমাদের দেহ ছুটির দাবীদার ।

ফারহানকে ফোনে জানানো হল, ‘সারপ্রাইজিং খবর আছে ।’

ওপাশ থেকে সেও গর্বের সাথেই জানাল ‘আমার কাছেও একই জিনিস আছে ।’

প্রত্যেকেই নতুন কিছু করার আনন্দে তখন উৎফুল্ল ।

 

*

পরবর্তী কার্যদিবসে উপস্থিত হয়েই রাইয়ান জানাল, টাকা ‘গন’ ।

আমরা সবাই বর্জ্রাহত হতেই ফারহান হাস্যোজ্জ্বল মুখে জানাল , ‘নট গন । ইনভেস্টেড । ’

 

টেবিলের ওপর একটা Galaxy S4 রেখে বলল, ‘আমাদের ক্লাবের জন্য একটা মোবাইলফোন দরকার ছিল । বার বার সিম খুলে চিমটিয়ে আর কতদিন ?’

 

সবসময় মাথা গরম কাফির হাত চলে গেল হোলস্টারে । পিস্তলটা বের করেই ম্যাগাজিন খালি করে দিল ও ফারহানের বুকে । অবশ্য কল্পনাতেই । মেজাজ খারাপ হলেই হোলস্টারে হাত দেয়ার মত একটা মুভ দিলেও সেখানে তার কোনকালেই হোলস্টার ছিল না ।

 

‘ওহে শ্যালক !’ মধুর সম্বোধন করল রাইয়ান । ‘আমাদের প্ল্যান ছিল আরেকটা ।’

পুরো প্ল্যান খুলে বলা হল ওকে । রীতিমত ঠোঁট বাঁকিয়ে আমির খান মার্কা গলায় ফারহান তার মূল্যবান মন্তব্য জানাল, ‘ইগনার কার ! ইগনার কার !!’

 

‘সম্ভব না শ্যালিকার স্বামিপ্রবর !’ পুনরায় মধুর ভাষা প্রয়োগ করল রাইয়ান । ‘সবাইকে গত অধিবেশনেই নিমন্ত্রণ করে দেওয়া হয়েছে ।’

‘হেহ – মাত্র ষাট হাজার তো ! বল দেখিনি কি বাদ যাচ্ছে খাবারের আইটেম থেকে তাহলে?’

 

‘গরু!!’ একযোগে হাঁক ছাড়লাম আমরা ক্ষোভে ।

‘চিল, ম্যান ।’ আকাশে ইদানিং চিল না থাকলেও আমাদের ম্যানদের এই কথা বলেই থাকে ফারহান । ‘গরু আমি ম্যানেজ করব ।’

তবে গরু বেশ ভালোভাবেই ম্যানেজ হয়েছে দেখলাম । গরুর বাজেটের সাথে সাথে আমাদের ইজ্জতও ‘গন’ ।

 

যুবরাজ সিং-এর মতই – যার ভাব দেখলে নাক-মুখ সমান করার অভিপ্রায় জেগেই থাকে – সানগ্লাস চোখে নাক আকাশের দিকে দিয়ে এখন সামনেই ফারহান ।

 

‘কাফি জানে?’ ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম ।

‘হুঁ’ এক কথায় জবাব দিল ফারহান ।

‘তোর ভূত ছুটায়নি গালি দিয়ে?’

‘না’ আবারও এককথায় । যেন ল্যাবের কুইজ দিচ্ছে । না-বাচক উত্তর দিলেও কুইজ কুইজ ভাব দেখেই যা বোঝার বুঝে ফেললাম ।

 

চারপাশে তাকালাম । মেম্বারদের ছড়াছড়ি সবখানেই । পরিস্থিতি মাথা কাটার মত হওয়ার আগেই কেটে পড়তে হবে এখান থেকে । সোজা নানার বাড়ি ।

 

কসাই মামা এখনও ছুড়ি ধার দিচ্ছে । গরুর লোভে অনেকেই এসেছে আজ এখানে । মেম্বারশিপের চাঁদার একটা গতি হল ভেবেই তারা খুশি । আর যদি গরু না পায় তবে ওই ছুড়ির ব্যাবহার কোথায় হতে পারে অনুমান করে হনুমান হয়ে গেলাম ।

 

আফটার অল, জিম করে করে এদের গুন্ডাসদৃশ বডি-বিল্ডিং-এর পথ আমরাই দেখিয়েছি বৈকি । এই প্রথমবারের মত জহির চাচার কথা সত্য বলে মনে হচ্ছিল একটু একটু ।

 

ভাবনার ছেদ কেটে গেল কারও হুংকারে –

‘আরে ধর ! ধর ! কাট ! কেটে ফেল !’

এবং সেই সাথে ঘোড়ার খুরের টগবগানি ।

 

তাজ্জব কান্ড ! এখানে ঘোড়া আসবে কোত্থেকে !!

আমাদের চিটিং বাজি তাহলে মেম্বাররা টের পেয়ে গেলই শেষ পর্যন্ত ?

একেবারে ঘোড়সওয়ার হয়ে আমাদের কাটতে এসেছে নিশ্চয় ?

 

*

লেজ উড়িয়ে – শিং নাড়িয়ে ছুটে আসা গরুটাকে দেখেই আমার ভুল ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল ।

মুহুর্তের জন্য জনতা থমকে গেলেও একযোগে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল গরুর ‘পোলার’ ওপর ।

গরু নিমেষেই ধরাশায়ী ।

 

কসাই আর তার অ্যাসিস্টেন্টদ্বয় এতক্ষণে হাত চালানোর সুযোগ পেয়ে আর দেরী করল না ।

 

কেবল আমারই একটু খটকা লাগল, কাফির পাশে দিয়ে বিড় বিড় করে বললাম, ‘গরুটা অনেকটা জহির চাচার কালো গাইটার মত না?’

 

আগুন চোখ নিয়ে কাফির হুংকার, ‘আরে কাটলে সব এক ! কাট ! কাট !! থমকে গেলি ক্যান তোরা ? আল্লাহু আকবর !’

 

সেটাই ! ভাবলাম । চেঙ্গিস খান আর নেপোলিয়ন !! দাঁড়াও তোমাকে ইতিহাসের প্রায়োগিক শিক্ষা দিচ্ছি । চেঙ্গিসের স্বভাব কেমন ছিল জেনে নাও … হুঁ হুঁ !!

 

*

সেদিনই সন্ধ্যা । মেম্বাররা সব তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেছে বাসায় ।

আমরা পাঁচজনই কেবল অফিসে ।

 

‘গরু ম্যানেজ করলি কি করে ?’ চোখ আকাশে তুলে জানতে চাইল রাইয়ান ।

‘রাস্তার পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছিল । দেখেই প্ল্যানটা মাথায় আসে । বাইরের পাড়ার দুই চারজন মেম্বারের কাছে ছড়িয়ে দিলাম গরু গেছে ছুটে । ত্রিমুখী ধাওয়া দিয়ে বাকিটুকু করা তো সহজ । ’

 

‘বাবারা ব্যাস্ত? ’ ভূত দেখার মত চমকে দেখলাম স্বয়ং জহির চাচা উপস্থিত ! নির্ঘাত বুঝে নিয়েছে !!

 

পকেট থেকে ফোন বের করে অযথায় রিসিভ করার ভান করে চেঁচিয়ে উঠল রাইয়ান, ‘কি বললা ? ভাইয়া অ্যাকসিডেন্ট করেছে? আমি এক্ষুণি আসছি । ’

অতঃপর ঝড়ের বেগে প্রস্থান ।

 

‘আমি একটু বাথরুমে – ’ বাক্য শেষ না করেই হাওয়া ফারহানও ।

 

দুই গোবেচারা বান্দা আমি আর কাফি তখন ।

‘বসুন। বসুন !!’ হঠাতই ব্যাগ্র হয়ে উঠলাম আমরা ।

 

‘ইয়ে …’ করুণ কন্ঠে শুরু করলেন জহির চাচা । ‘সমাজসেবার নামে খাওয়া দাওয়া ফূর্তি করে তোমাদের হাড়ে মরচে পড়ে গেছে বুঝতে পারছি । তাই আমার গরুর-’

‘আমরা দাম দিয়ে দেব !!’ হড়বড় করে বললাম আমরা ।

 

‘কি হল তোমাদের ?’ ভুরু কুঁচকালেন চাচা, ‘বলছিলেম আমার গরু আজ রাতে বাসায় ফেরে নি । তোমরা কি একটু কষ্ট করে খুঁজে দেখবে ? কিসের দাম দিতে চাচ্ছিলে তোমরা ?’

‘না চাচা , মানে সমাজসেবা -’ আমতা আমতা করলাম আমি ।

‘- সমাজসেবার নামে খাওয়া দাওয়ার মূল্য আমরা শোধ দেব আপনার উপকারে এসে’ বাক্য সম্পূর্ণ করে দিল কাফি । ‘চল বেরোই’ আমাকে টান দিল ও । ‘আপনি চিন্তা করবেন না চাচা । গরু আশেপাশেই আছে হয়ত ।’

 

অমায়িক হাসি দিলেন জহির চাচা ।

আর আমার পেট রীতিমত গুড়গুড় করে উঠল ।

 

আশে পাশেই বৈকি ! আমার আর কাফির পেটেই আছে বেশ একটা অংশ । আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই দুই কিলোমিটারের মধ্যেই বাসায় বাসায় তরুণসমাজের পেটে আছে বাকি গরু ।

‘ইয়ে চাচা?’ ডাক না দিয়ে পারলাম না , ‘আপনার তথ্যে একটা ভুল ছিল ।’

‘কি ভুল বাবা ?’

‘চেঙ্গিস খান ইতিহাসের পাতায় অমর বটে । তবে নৃশংসতার জন্য । সমাজসেবার জন্য নয় ।’

 

জহির চাচার মুখটা কেমন জানি ফ্যাকাসে হয়ে গেল ।

 

এর দুই মাসের মধ্যেই রীতিমত ব্যস্ততার সাথেই তুলে ফেলা হল গর্বিত মিরবাগ সমাজসেবী যুবসংঘকে ।